advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস: বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় গর্বিত অংশীদার বাংলাদেশ

মেজর মুহাম্মদ মাসুদুর রহমান
২৯ মে ২০২২ ০৪:৩৩ পিএম | আপডেট: ২৯ মে ২০২২ ০৪:৩৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
advertisement

২৯ মে, আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস। দিবসটি এলেই বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অহংকার, অবদান আর সাহসিকতার দৃশ্যপট সামনে আসে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। বর্তমানে বিশ্বের নয়টি মিশনে সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর ছয় হাজার ৮০২ সদস্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। 

স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের অন্যতম একটি সফলতার অধ্যায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মজ্জা বা সমকক্ষ হিসেবে অভিহিত করে থাকে।

যুদ্ধ-সংঘাত কখনো কোন দেশের জন্যই সুফল বয়ে আনতে পারে না। শান্তি বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ-সংঘাত ত্যাগ করতে হয়। বিশ্বের সংঘাতময় অঞ্চলগুলোতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে জন্ম হয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষীদের মহান আত্মত্যাগকে স্মরণ করে ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এর আগে, ইউক্রেনের শান্তিরক্ষী সংস্থা এবং ইউক্রেন সরকারের যৌথ প্রস্তাবনায় ২০০২ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গৃহীত ৫৭/১২৯ প্রস্তাব অনুযায়ী এ দিবসের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকালীন যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে গঠিত জাতিসংঘ ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশনকে অবলম্বন করে ২৯ মে তারিখটি নির্ধারণ করা হয়।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশনই (আন্টসো) হচ্ছে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী। এই হিসেবে (১৯৪৮ সাল থেকে) জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী ৭৪ বছর পূর্ণ করল। এদিনে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী বাহিনীর কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী সব পুরুষ-নারীকে শান্তিরক্ষার লক্ষ্যে সর্বোৎকৃষ্ট পেশাদারি মনোভাব বজায়, কর্তব্যপরায়ণতা, নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের আত্মত্যাগের ঘটনাকে গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ, শান্তিরক্ষায় নারীদের অবদান ও ভূমিকার ওপর বিশেষ ভাবে গুরুত্বারোপ করে। শান্তিরক্ষায় নারীর ভূমিকা ও লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ওই পদক্ষেপ গ্রহণ করে জাতিসংঘ।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এ দিবসটি যথাযথ তাৎপর্যের সঙ্গে পালন করা হয়। এদিন নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দফতরে সম্মানসূচক ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড’ পদক বিতরণ করা হয়।

জাতিসংঘের অধীনে চলতি বছর বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী বাহিনী ৩৪ বছর পূর্ণ করল (১৯৮৮-২০২২)। তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে যুদ্ধরত সিরিয়ায় একটি মেডিকেল টিম পাঠিয়ে শান্তিরক্ষায় মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বন্ধুত্ব স্থাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে স্বীকৃতি দেয়। ইতোমধ্যে নিজেদের কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা প্রশংসিত হয়েছেন দেশ-বিদেশে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ১৯৮৮ সালে ইউএন ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভেশন গ্রুপ (ইউনিমগ) মিশনে মাত্র ১৫ জন সেনা পর্যবেক্ষক প্রেরণের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই থেকেই বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল পথচলা শুরু। পরবর্তী কয়েক বছর বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী বেশ সুনাম ও কৃতিত্বের সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে গেছে। ১৯৯৩-৯৪ সালে সবচেয়ে আলোচিত রুয়ান্ডা, সোমালিয়া ও বসনিয়া-এ তিনটি শান্তি মিশনে নিজেদের সক্ষমতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আলোচনার কেন্দ্রমূলে আসে।

সে সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দক্ষতা এবং সামরিক জ্ঞানে রুয়ান্ডায় বেলজিয়ান, সোমালিয়ায়, আমেরিকান ও বসনিয়ায় ফ্রান্স সেনাবাহিনীকে যে পেরিয়ে যেতে পারে তা জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মকর্তাদের চিন্তার মধ্যেই ছিলোনা। তখন থেকেই মূলত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় হতে থাকে।

১৯৯৪ সালে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেড গ্রুপ সেখানে নিয়োজিত ছিল। প্রায় ১০০ দিনের গৃহযুদ্ধে তখন ৮ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছিল। সেই মিশনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বেলজিয়ানসহ আফ্রো-ইউরোপিয়ান ব্যাটালিয়নগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করে তাদের মিশন স্থগিত করে ফেললেও বাংলাদেশের সেনাসদস্যরা বুকে সাহস নিয়ে মিশন এলাকাতেই থেকে যায়। ফলে গণহত্যায় মৃত্যুর হার অনেক কম হয়েছিল। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকেও সেখান থেকে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। বাংলাদেশি সৈনিকদের এমন সাহস ও দক্ষতা দেখে তখন সবাই অবাক হয়েছিল। সোমালিয়া থেকে জাতিসংঘ শান্তি মিশন গুটিয়ে নেওয়ার সময় আমেরিকান সেনারা দাবি জানিয়েছিল, তাদের শেষ সৈনিক সোমালিয়া না ছাড়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সেনাদের তাদের সঙ্গে থাকতে হবে।

বিভিন্ন সময়ে মিশন অঞ্চলে সে দেশের জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে নিয়েছে। স্থানীয় জনগণের আস্থা আর ভালোবাসাই জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশি সেনাদের মূল শক্তি। প্রত্যেকটি মিশনেই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষদের এ দক্ষতা জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের বিমোহিত করেছে। শৃঙ্খলা, সততা, কর্মনিষ্ঠা ও সামরিক দক্ষতার জন্য যে কোনো সামরিক কমান্ডারদের কাছে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

১৯৯৫ সালে বসনিয়ায় ফ্রান্স শান্তিরক্ষী ব্যাটালিয়ন প্রত্যাহার করলে বাংলাদেশি সেনারা তাদের জায়গায় কাজ শুরু করে। ৩৪টি দেশের সেনাদের সঙ্গে একসাথে কাজ করে তখন বাংলাদেশের ব্যাটালিয়ন শান্তিরক্ষার কাজে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিল।

সবাই ধারণা করেছিল, বাংলাদেশের সেনারা ফ্রান্সের সেনাদের জায়গায় কাজ করতে পারবে না। কিন্তু, যেখানে ডাচ আর ইউক্রেন সেনারা বসনিয়ার ‘সাব্রানিৎসা’ ও ‘জাপা’ নামক দুটি শহরে গণহত্যা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশি সেনারা তাদের তুলনায় অনেক হালকা অস্ত্র নিয়েও শুধু সাহস, সততা, দক্ষতা আর দৃঢ় মনোবল দিয়ে বসনিয়ার বিহাচ শহরের জনগণকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিল।

কঙ্গো, মালি, সুদান, সাউথ সুদান, সাহারা, লেবানন, হাইতি, পূর্ব তিমুর প্রভৃতি স্থানে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ একটি সুপরিচিত আস্থার নাম। বিশ্বের ৪০টি দেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর্তমানবতার সেবা দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ৫৫টি শান্তিরক্ষা মিশন সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা মিশন অঞ্চলে বিবাদমান সশস্ত্র দলকে নিরস্ত্রীকরণ, সড়কে পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ, নির্বাচনে সহায়তা প্রদান, শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানসহ সড়ক ও জনপথ এবং স্থাপনা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলছে। তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গত ৩৪ বছরে এ দেশের প্রায় ১৬১জন শান্তিরক্ষী প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন।

শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়।’ বিশ্বের বিরোধপূর্ণ স্থানে জাতিসংঘের ডাকে শান্তি স্থাপন করা, এ জন্য আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর জরুরি দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে। জাতিসংঘকে শান্তি স্থাপনে সহায়তা দেওয়া এবং পাশাপাশি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমাদের সুশিক্ষিত ও পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী থাকাটা অন্যতম শর্ত। বর্তমান শতাব্দীতে তৃতীয় প্রজন্মের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বহুমাত্রিক ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এজন্য আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিন বাহিনীর ধ্যানধারণা, চিন্তাচেতনার আধুনিকায়ন করে যেতে হচ্ছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা-মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের সঙ্গে হৃদয়ে মিশে গেছেন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকায় প্রশংসিত হয়ে সিয়েরালিওন তাদের দেশের প্রধান ভাষা বাংলা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সংবিধান অনুযায়ী করতে না পারায় দেশটির দ্বিতীয় ভাষা এখন বাংলা। ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে অদ্যাবধি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সর্বোচ্চ পেশাদারি মনোভাব, সততা, কর্মনিষ্ঠা আনুগত্য ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। তাদের অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে এবং আমাদের শান্তিরক্ষীরা শান্তিরক্ষা-মিশনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার পাশাপাশি বিশ্বেও বহু দেশেরই সংঘাতপূর্ণ এলাকার জনমনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। যেসব দেশের সাধারণ মানুষএকসময় ‘বাংলাদেশ’ এর সাথে খুব একটা পরিচিত ছিলোনা, মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদেও ন্যায়-নিষ্ঠা ও আচার-আচরণে সেসব দেশের জনসাধারণের কাছে এখন বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে অতি আবেগ ও শ্রদ্ধার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সর্বোপরি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহনের পর বাংলাদেশের সেনাদের পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, সততা ও মানবিক আচরণের কারণে বিশ্বের বুকে বাঙালি ও বাংলা ভাষার পরিচিতি বেড়েছে কয়েকগুন। জাতিগত পরিচয়, ধর্ম চর্চা, শারীরিক বর্ণ-গোত্র, সাম্প্রদায়িক বৈষম্যকে ভালবাসায় রূপ দিয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিজেদের উৎসর্গ করেছেন বিশ্বমানবতার মহান সেবায়। যার কারণে যুদ্ধাবস্থা বিরাজকৃত অঞ্চলগুলোর মানুষের কাছে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা হয়ে উঠেছেন আদর্শ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলছেন জাতিসংঘে নিয়োজিত বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা। জাতিসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে বর্তমানে দেশের রেমিট্যান্স আয় হচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকার অধিক।

জাতিসংঘের সমীকরণ অনুযায়ী, ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে অদ্যাবধি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সর্বোচ্চ পেশাদারি মনোভাব, আনুগত্য ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। তাদের অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। এদেশের শান্তিরক্ষীরা শান্তিরক্ষা মিশনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবদান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অচলাবস্থা সৃষ্টিকারী করোনা মহামারির মধ্যেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি স্থাপনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে ওই সব দেশের জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন। জাতিসংঘ মিশন এবং বহুজাতিক বাহিনীতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অনন্য অবদান বিশ্বের দরবারে দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও শান্তিরক্ষায় জীবন উৎসর্গের জন্য শান্তিরক্ষীদের মাঝে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস কর্তৃক বীরত্বপূর্ণ অবদানে স্বীকৃতি স্বরূপ ‘ড্যাগহ্যামারশোল্ড’ পদক প্রদান করা হয়। গত ২৭ মে ২০২২ শুক্রবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অসুষ্ঠানে এ বছর ৪২ টি দেশের ১১৭ জন নারী ও পুরুষ এই পদক প্রাপ্ত হয়েছেন। যার মধ্যে ৫৫ জন সামরিক, ২ জন পুলিশ ও ৬০ জন বেসামরিক শান্তিরক্ষী রয়েছেন।

বাংলাদেশের ২ জন শান্তিরক্ষী লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ কে এম মাহমুদুল হাসান, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং ল্যান্স কর্পোরাল মোঃ রবিউল মোল্লা, দক্ষিণ সুদানে শান্তি রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য উক্ত পদক লাভ করেছেন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল একেএম মাহমুদুল হাসান সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে নিয়োজিত মিনুসকা মিশনে এবং ল্যান্স কর্পোরাল মো. রবিউল মোল্লা দক্ষিণ সুদানে নিয়োজিত আনমিস মিশনে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন।

বাংলাদেশী পদকপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে এই সম্মাননা গ্রহণ করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতেমা।

এর আগে, গত বছর কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশের আট শান্তিরক্ষী, মালিতে নিয়োজিত মিনুস্মা মিশনের ওয়ারেন্ট অফিসার আব্দুল মো. হালিম, কঙ্গোতে নিয়োজিত মনুস্কো মিশনের ওয়ারেন্ট অফিসার মো. সাইফুল ইমাম ভূঁইয়া,  সার্জেন্ট মো.  জিয়াউর রহমান, সার্জেন্ট এমডি মোবারক হোসেন ও ল্যান্স করপোরাল মো. সাইফুল ইসলাম, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে  নিয়োজিত মিনুস্কা মিশনের ল্যান্স করপোরাল মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সার্জেন্ট মো. ইব্রাহীম এবং দক্ষিণ সুদানে নিয়োজিত আনমিস মিশনের ওয়াসারম্যান নুরুল আমিনকে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য 'ড্যাগ হ্যামারশোল্ড' পদক দিয়েছিলো জাতিসংঘ।

জাতিসংঘ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় প্রতিবছর বাংলাদেশেরও আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়।

এর মধ্যে শহিদ শান্তিরক্ষীদের নিকটাত্মীয় এবং আহত শান্তিরক্ষীদের জন্য সংবর্ধনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ উপস্থাপনা ছাড়াও শান্তিরক্ষী দৌড় প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ জার্নাল ও জাতীয় দৈনিক গুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের কার্যক্রমের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হয়। 

এদিন আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও অন্যদের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী, তিন বাহিনী প্রধান, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সামরিক উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যরা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও), পুলিশের মহাপরিদর্শক ঊর্ধ্বতন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে শান্তিরক্ষীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

‘দেশের প্রতিরক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ আর জনগণের জন্য ভালোবাসা’- এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পৃথিবীর যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও দুর্যোগময় পরিবেশে শাস্তি স্থাপন করে অপরিচিত দেশের অচেনা মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষী মিশনে যোগ দিয়ে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে এখন বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী পরিচিত একটি আস্থার প্রতিষ্ঠান।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগদানের ৩৪ বছর ধরে সুনাম, ভালোবাসা, কৃতিত্ব ও সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আঘাত, সংঘাত, ভয়ভীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা শান্তির বার্তা নিয়ে বিশ্বমানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন নিরন্তর।

আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণ ও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ৩৪ তম বর্ষপূর্তিতে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ অবদান রাখা বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি। শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বব্যাপী।