advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের ব্যবহার-সংরক্ষণ নিয়ে যা বললেন বিশেষজ্ঞরা

মৌরী সিদ্দিকা
৬ জুন ২০২২ ০৬:৪৩ পিএম | আপডেট: ৬ জুন ২০২২ ১০:২৯ পিএম
অধ্যাপক শরিফ এনামুল কবির (বাঁয়ে) ও ইমতিয়াজ হাসান। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের পর একটি রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড নামের এই যৌগ পানির সঙ্গে অক্সিজেনের অতিরিক্ত অণু যোগ করে তৈরি করা হয়। বিশুদ্ধ অবস্থায় এটি বর্ণহীন তরল ও সংক্রমণনাশক। এটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে কাজ করে।

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের ব্যবহার

advertisement 3

গাঢ় হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রকেটের জ্বালানিতে প্রোপেল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৯২০ সাল থেকে এটি অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়া হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অক্সিজেনের অভাবে গাছে কোনো সমস্যা দেখা দিলে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি খাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়।

advertisement 4

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড মূলত দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। তবে শরীরের ভিতরে গ্রহণ করার জন্য এই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। খুবই হালকা ঘনত্বের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বাথরুম পরিষ্কার, কাপড় থেকে দাগ দূর করা, দাঁত সাদা করার জন্য ব্যবহৃত হয়। গৃহস্থালির কাজে ও স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ৩ শতাংশ ঘনত্বের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ৩ শতাংশ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দ্রবণ ওষুধ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের ক্ষতিকর প্রভাব

রঙহীন তরল তেতো স্বাদের এই পদার্থটি গিলে ফেললে বা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে বিচ্ছিন্নভাবে জ্বালাতন করতে পারে। বমি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, অবশ, ফুসফুস সংকুচিত হওয়া, কম্পন, মানসিকভাবে সমস্যা হতে পারে। স্বল্পমেয়াদী ফলাফলগুলো প্রকট হতে পারে এবং সেগুলো ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। এটি এতটা শক্তিশালী যে, এই রাসায়নিক পদার্থ ফুসফুসে পৌঁছালে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমতে পারে। এমকি দীর্ঘমেয়াদি নষ্টও করে দিতে পারে। চোখে লাগলে প্রথমে জ্বালাতন করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্ধত্বের কারণও হতে পারে।

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড উত্তপ্ত হলে তাপীয় বিয়োজনে বিস্ফোরক হিসেবে আচরণ করে। এটি কম তাপে স্থানান্তর করা দাহ্য পদার্থ নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে আগুনের তীব্রতা ঘটাতে পারে। এটি নিজে আগুন না জ্বালালেও জৈব যৌগের সংস্পর্শে বিস্ফোরক মিশ্রণ তৈরি করে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরিফ এনামুল কবির বলেন, ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড প্রধানত টেক্সটাইল শিল্পের ডাইং, ফার্মাসিউটিক্যাল, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, বিউটিফিকেশেন, ফুড প্রসেসিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এটির ব্যবহারের শেষ নেই। প্রত্যেকটি ল্যাবে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থাকে।’

এই রসায়নবিদ বলেন, ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড যারা ব্যবহার করছেন, তাদের এ বিষয়ে জ্ঞান থাকা উচিত কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। আমরা সামান্য যে রাসায়নিক কিনি গবেষণার জন্য, সেটাও বিদেশ থেকে লিকুইডটা আনতে দেয় না। প্রত্যেকটি রাসায়নিকে লেবেল দেওয়া থাকে জীবনঝুঁকি আছে কি না—এটা নিশ্চিত করতে। যারা ব্যবহার করছেন, তাদের নিশ্চয়ই লাইসেন্স আছে। আর বাকিটা আমরা কতটা কন্ট্রোল করতে পারছি, তার ওপর নির্ভর করছে। পুরান ঢাকা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।’

অধ্যাপক শরিফ এনামুল কবির বলেন, ‘বাড়িতে তো আমরা কেউই ফায়ার স্ট্রিম ব্যবহার করি না। আমরা সবাই বহুতল ভবনে বাস করছি। সরকারের এ বিষয়গুলো নিয়ে কঠোর নীতিমালা করা উচিত।’

এই অধ্যাপক বলেন, ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার না করলে আমাদের বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তবে নিয়ম-কানুন মেনে ব্যবহার করতে হবে। পরিবেশবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যত ল্যাবরেটরি আছে, সবটাতেই হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার করা হয়। বিদেশে সামান্য গবেষণাগারেও জাতীয় কমিটি থাকে, যা আামাদের ধরা-ছোঁয়ারও বাইরে।’ 

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ হাসান বলেন, ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ওষুধ, লন্ড্রি, দাঁত পরিষ্কার করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। লন্ড্রির দোকানদার যেমন বৈধভাব না পেয়ে অবৈধভাবে কিনছেন, এভাবেই অবৈধভাবে দেশে বিভিন্ন জায়গায় এটি ব্যবহার হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ল্যাবে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে এটি থেকে আগুন ধরতে না পারে।’

আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন বৃষ্টিতে না ভেজার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব ওঠেছে। এ বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের রিঅ্যাকশন খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এটি নিজে দাহ্য নয়, অক্সিজেন দান করে আগুন তৈরি করতে পারে। আমরা নিশ্চিত নই, ওখানে আরও কোনো রাসায়নিক ছিল কি না। থাকলেও একটা সাময়িক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সেটা দীর্ঘদিন থাকবে মনে করে থাকলে সেটি ভুল ধারণা।’

সীতাকুণ্ডের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, ‘এটি আমাদের দীর্ঘ অবহেলা ও জাতিগত অসচেতনতার পরিণতি। এটি চরম অবহেলা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অনেক শক্তিশালী ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল, যেটা তারা নেননি। সেটারই ফলাফল এগুলো। এগুলো ঘটতে থাকবে। আমরা শিক্ষাটা নিচ্ছি না।’

ইমতিয়াজ হাসান বলেন, ‘পানি দিয়ে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের আগুন নেভানো যাবে না—এটা সঠিক নয়। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের নিজের দাহ্যতা না থাকলেও যথেষ্ট পরিমাণ দাহ্য অবস্থা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এটিকে পানি দিয়েই নেভাতে হয়। সেখানে এত বেশি পরিমাণ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ছিল, যার কারণে পানি দিয়ে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।’

advertisement