advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভূমিকম্প হ্রাসে গবেষণার গুরুত্ব

ড. এ. কে. এম. খোরশেদ আলম
১২ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১২ জুন ২০২২ ০১:১৩ এএম
প্রতীকী ছবি।
advertisement

১৮৯৭ সালে ১২ জুন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম একটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ৮ দশমিক ১ মাত্রার এ ভূমিকম্পের অনুভূত এলাকা বিস্তৃত হলেও জনসংখ্যা ও অবকাঠামোর স্বল্পতা এবং হালকা গৃহনির্মাণ সামগ্রীর কারণে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম ছিল। বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীর অন্যতম একটি সক্রিয় টেকটোনিক অঞ্চলে হওয়ায় আমরা প্রায়ই ভূকম্পন অনুভব করি। এ দেশের উত্তরে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেট এবং পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণে ভারতীয় ও বার্মিজ প্লেটের চলমান টেকটোনিক প্রক্রিয়া এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তি ঘটায়।

গত আড়াইশ বছরে বাংলাদেশ ও আশপাশে ৭.০ বা তার বেশি মাত্রার ৯টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। দুটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের মধ্যে। তবুও গত ২৫ বছরে দেশে ৪.২-৬.১ মাত্রার অনেক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। কোনো অঞ্চলের ভূঅভ্যন্তরে টেকটোনিক কারণে ক্রমান্বয়ে শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। একটা সময় পরে সঞ্চিত শক্তি কোনো দুর্বল অংশ ভূতত্ত্বের ভাষায় ফল্ট বা চ্যুতি দিয়ে ভূমিকম্প আকারে বিমুক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটে অর্থাৎ ওই এলাকায় আবার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তা শত শত, এমনকি হাজার বছর পরও হতে পারে।

দেশের ভূতত্ত্ববিদরা বড়মাত্রার ভূমিকম্প উৎপাদনে সক্ষম এমন কয়েকটি চ্যুতি, যেমন- উত্তরদিকের ডাউকি ও পূর্বদিকের প্লেট বাউন্ডারি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটিতে ১৮৯৭ ও দ্বিতীয়টিতে ১৭৬২ সালে বড়মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল।

ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে এ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা হলোসিন উপযুগের নরম ও অসংহত পলি দিয়ে গঠিত, ৮ শতাংশ প্লেইসটোসিন উপযুগের কাদাসমৃদ্ধ মৃত্তিকা এবং অবশিষ্ট ১২ শতাংশ টারসিয়ারি যুগের পাললিক শিলা দিয়ে গঠিত। এসব পলি-মাটি-শিলা ভিন্ন ভৌত ও ভূপ্রযুক্তিক গুণাগুণসম্পন্ন হওয়ায় ভূকম্পনে ভিন্ন ধাঁচে প্রভাবিত হয় আবার ভিন্নমাত্রার কম্পনে দৃশ্যপটে ভিন্নতা আসে। ভূকম্পনে পানিসিঞ্চিত ও বালুসমৃদ্ধ নরম এবং অসংহত পলিমাটি শক্তি হারিয়ে তরল পদার্থের মতো আচরণ করে- যাকে ‘লিকুফ্যাকশন’ বলে। এ অবস্থা মাটির ওপর নির্মিত ভবন বা অবকাঠামোকে ধরে রাখার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় মাটিতে দেবে গিয়ে ঝুঁকির কারণ হয়।

অতীতের ভূমিকম্পজাত এমন লিকুফ্যাকশনের ব্যাপারে জানা থাকলেও ২০১৭ সালের ৫ দশমিক মাত্রার ঢালাই (ত্রিপুরা, ভারত) ভূমিকম্পে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ এলাকায় এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। ভূমিকম্প নিজে কাউকে না মারলেও অবকাঠামো ধংস করে জান-মালের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি ভূমিকম্পকালে হুড়াহুড়ি করে ভবন থেকে বের হতে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, কোথাও ভূমি দেবে গিয়ে ভবনের ক্ষতি হয়েছে।

বিগত পঞ্চাশ বছরে আমাদের দেশের জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি থেকে বেড়ে ষোলো কোটি বিরাশি লাখের (জুলাই ২০২১) বেশি হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নগর জনসংখ্যা বেড়েছে এবং প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বৃদ্ধির এ প্রবণতা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। এ দেশের অতি নিকটবর্তী হিমালয় অঞ্চলের প্রধান তিনটি চ্যুতির সর্বদক্ষিণের মেইন ফন্ট্রাল থ্রাস্ট নামে পরিচিত চ্যুতিটি ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত উপ-হিমালয় অঞ্চলের অন্যান্য নবীন চ্যুতিগুলো ভূমিকম্প উৎপাদনে সক্ষম।

অতিসাম্প্রতিক এক গবেষণাপত্রে এমন কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে- যা আমাদের দেশের বাইরে হলেও নিকটবর্তী হওয়ায় ভূমিকম্প সংঘটন এ দেশেও তার প্রভাব ফেলবে।

আতঙ্ক সৃষ্টি এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয়, বরং অনন্য ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যম-িত দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং একুশ শতকের উপযোগী জ্ঞান ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সক্ষমতা অর্জন তথা টেকসই উন্নয়ন অর্জনই উদ্দেশ্য। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

ড. এ. কে. এম. খোরশেদ আলম : গবেষক ও ভূতত্ত্ববিদ