advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ত্রাণ কম, মানবেতর জীবন

এক মাসে বরাদ্দ ৫১২০ মে. টন চাল নগদ সহায়তা সাড়ে ৫ কোটি টাকা দুর্গত এলাকায় নৌকা সংকটও তীব্র

ইউসুফ আরেফিন,ঢাকা ও সজলছত্রী,সিলেট
২৩ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুন ২০২২ ০৮:৫৫ এএম
advertisement

সিলেটে ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে মানুষ। বানের পানির তোড়ে যোগাযোগহীন এলাকা তো আছেই, খোদ নগরীর আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও তীব্র খাবারের সংকট। সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এ নিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি জানান, মাত্র ৩০ টন চাল সিটিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তবে ত্রাণ বরাদ্দ হবে এবং কেউ না খেয়ে থাকবে না বলে মঙ্গলবার সিলেট সার্কিট হাউসে মেয়রকে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ মে থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত সারাদেশে ৫ হাজার ১২০ টন চাল, নগদ প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা এবং ১ লাখ ১৫ হাজার খাবার প্যাকেট অন্যান্য খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব খাদ্যসামগ্রী ও নগদ টাকা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। তবে দুর্গত এলাকার জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, বন্যাদুর্গত জনসংখ্যার তুলনায় বরাদ্দ খুব বেশি নয়। কারণ প্রায় এক কোটি মানুষ পানিবন্দি আছে।

advertisement

এ ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগ, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের ত্রাণসামগ্রী জেলা শহরগুলোর আশপাশের বন্যাদুর্গতরাই পাচ্ছেন। দূরবর্তী অঞ্চলের দুর্গতরা সহায়তার বাইরে রয়ে গেছেন।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের তিন তলায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনশতাধিক মানুষ। তাদের কাছে পৌঁছায়নি তেমন কোনো খাবার। হাতের পাঁচ খরচ করে একবেলা খেয়ে বেঁচে থাকছেন তারা। তবে গতকাল নগরীর মির্জাজাঙ্গাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে দেখা যায়, স্থানীয় কাউন্সিলর শান্তনু দত্ত সন্তু ও স্বেচ্ছাসেবীরা চেষ্টা করছেন অন্তত দু বেলা খাবার সরবরাহের। তারা বলছেন, বিপুলসংখ্যক মানুষের সব চাহিদা মেটানো অসম্ভব। তবে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন যেন খাবার ও পানি নিশ্চিত করা যায়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গতকাল বুধবার সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নে ত্রাণ নিয়ে যান মহানগর পুলিশ। দুর্গম এলাকায় নৌকা নিয়ে যেতে খোদ মহানগর পুলিশকেও গলদঘর্ম হতে হয়। বাদাঘাটে প্রায় এক ঘণ্টায় জোগাড় করা হয় তিনটি নৌকা। প্রায় দেড় ঘণ্টা ইঞ্জিন নৌকা চালিয়ে যে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া হয় সেটিও পানিবন্দি। পথঘাট সবই পানির নিচে। পানির তোড়ে ভেঙেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। ত্রাণ নিতে আসার একমাত্র বাহনও নৌকা। ছোটো ছোটো একেকটি নৌকায় এসেছেন দুই থেকে চারটি পরিবার। বন্যার্তদের ভিড় বেশি হওয়ায় এক নৌকায় একটি প্যাকেট দেওয়া হচ্ছিল। বন্যার্তরা জানালেন, অনেকেই এজন্য পাননি কাক্সিক্ষত ত্রাণ।

বন্যার্তরা জানালেন, যা পাচ্ছেন তা খেয়েই কোনোক্রমে দিনাতিপাত করছেন তারা। বন্যা তাদের সব নিয়েছে, যা বাকি আছে সবই এখন পানির নিচে।

ত্রাণ বিতরণ শেষে মহানগর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ বলেন, ত্রাণের কোনো ঘাটতি নেই। সমস্যা হচ্ছে পৌঁছানো নিয়ে। কারণ নৌকার প্রবল সংকট। দুর্গম এলাকায় নৌকা যেতেও রাজি হচ্ছে না অনেক সময়।

চালু হচ্ছে ওসমানী বিমানবন্দর, আবার রেল বন্ধ হবার জোগাড় : বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে। দুদিন পর বন্যার পানি নেমে গেলেও এপ্রোচ লাইট তলিয়ে থাকার কারণে গত ৫ দিন ধরে বন্ধ ছিল সিলেট বিমানবন্দরে ফ্লাইট উঠানামা। আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) থেকে ফের চালু হচ্ছে এই বিমানবন্দর। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিমানবন্দরের স্টেশন ম্যানেজার আব্দুস সাত্তার।

এদিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় বন্যার পানি বাড়ছে। রেললাইনে পানি ওঠতে থাকায় সারাদেশের সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের রেল যোগাযোগ আবারও বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গেল কয়েক দিন থেকে টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওরের তীরবর্তী কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার অধিকাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে বরমচালের ফানাই-আনফানাই নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় প্রায় ২শ ফুট রেললাইনে সোমবার বিকাল থেকে পানি উঠতে শুরু করে। সময় যতই যাচ্ছে ততই বাড়ছে পানি। ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে ওই স্থানের রেললাইন।

৯৯৯-এ কলে খাবার পেল বানভাসি ৩২ পরিবার : বন্যাকবলিত হনুফা বেগম (৪৫) নামে এক নারীর ৯৯৯-এ কলে শুকনো খাবার জুটছে বানভাসি ৩২ পরিবারের। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর থেকে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ওই নারী কান্নাকণ্ঠের কলটি সংযুক্ত করে দেওয়া হয় সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমানকে। অপর প্রান্ত থেকে আরেক নারীর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। হনুফা বেগম তখন পুলিশের কর্মকর্তাকে পরিচয় ও ঠিকানা দিয়ে বলেন, গত বুধবার থেকে বন্যা শুরু হলে পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় গত শুক্রবার থেকে তাদের গ্রামের ৩২টি পরিবার বন্যার পানিতে আটকে পড়েন। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। কূলকিনারা না পেয়ে গ্রামের পাশে থাকা বড় বড় কয়েকটি বালুবাহী স্টিলের নৌকায় আশ্রয় নেন। মোবাইল নেটওয়ার্কও অকার্যকর হয়ে পড়ে। এক সময় খাবারের মজুদও শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা টানা তিন দিন ধরে অভুক্ত আছেন। তাদের জরুরি ভিত্তিতে খাবার প্রয়োজন। দিনমজুর স্বামী রহমত আলীর স্ত্রী হনুফা বেগমের বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম চাটিবহর কোনাগাঁও গ্রামে। হনুফার কলের পরপরই সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান কোম্পানীগঞ্জ থানাপুলিশকে ওই নারী ও গ্রামটির ৩২ পরিবারের জন্য দ্রুত খাবার পাঠানোর নির্দেশনা দেন। এরপর থানার উপপরিদর্শক মো. আজিজুর রহমানসহ কয়েকজন খাবার নিয়ে গ্রামটির উদ্দেশে নৌকায় করে রওনা দেন। রাত ৮টার দিকে পুলিশের সদস্যরা গ্রামটিতে পৌঁছে অভুক্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনো খাবার তুলে দেন।

কোন জেলায় কত সরকারি ত্রাণ : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিলেট জেলায় ২ হাজার ২০০ টন চাল, এক কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং ৩৫ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলায় ১ হাজার ৭২০ টন চাল, এক কোটি ৫৮ লাখ টাকা ও ২৭ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; নেত্রকোনা জেলায় ২শ টন চাল, ৩০ লাখ টাকা, ৮ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট; রংপুরে তিন হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; নীলফামারীতে ৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; কুড়িগ্রামে ১০ লাখ টাকা ও এক হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; হবিগঞ্জে ১০ লাখ টাকা ও ২ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; মৌলভীবাজার জেলায় একশ টন চাল, ১০ লাখ টাকা ও ২ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; শেরপুরে ১০ লাখ টাকা ও ৪ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; জামালপুরে ৪ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট; কিশোরগঞ্জে ২ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ত্রাণ) শেখ মো. মুনিরুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, নতুন নতুন প্লাবিত এলাকাগুলোয় আমাদের নজর আছে। যেসব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ত্রাণের চাহিদা পাঠাচ্ছেন তাদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যেখানে যা লাগছে তা আমরা বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছি। ত্রাণসামগ্রীর কোনো ঘাটতি নেই বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

দুর্গত মানুষের পাশে রেড ক্রিসেন্ট : সিলেট অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি দুর্গত মানুষকে সহায়তা দিতে কাজ করছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সংস্থার ৫শর অধিক স্বেচ্ছাসেবক সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ অন্যান্য জেলায় বন্যাকবলিত মানুষদের নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে শুকনো ও রান্না করা খাবার, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছেন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নূর-উর-রহমান জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

advertisement