advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অহঙ্কারের পদ্মা সেতু

তারাপদ আচার্য্য
২৪ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুন ২০২২ ১০:৩১ পিএম
advertisement

অধরা ছিল পদ্মা সেতু। স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল- যখন দুর্নীতির কথা বলে বিদেশি সংস্থাগুলো ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। কিন্তু থেমে থাকেনি সরকার। থেমে থাকেনি বাঙালি। স্বপ্নপূরণে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ঘোষণা দেওয়া হয়- আমাদেরই টাকায় হবে বহুমুখী পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন।

advertisement

১৯৯৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানী এবং দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-খুলনা মহাসড়কে পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য ৩ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৮ দশমিক ১০ মিটার চওড়া এ সেতুটিকে দেশের সম্ভাব্য দীর্ঘতম সেতু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৬-০৭ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

পদ্মা নদীর ওপর বহুমুখী আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’র নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। মূল প্রকল্পের পরিকল্পনা করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট। ওই সময় ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট খরচ করা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। সেতুর দৈর্ঘ্য হয় ৬ দশমিক ১৫০ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১৮ দশমিক ১০ মিটার। স্প্যান বসানো হয় ৪১টি। ২০১৪ সালের ১৭ জুন পদ্মা সেতু নির্মাণে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বাংলাদেশ সরকার ও চীনের চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির সঙ্গে। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চীনের কোম্পানি পদ্মা সেতুর কার্যাদেশ পায়। শুরু হয় পদ্মা সেতুর কাজ। প্লিলার বসাতে গিয়ে অনেক বাধা-বিপত্তি এসেছে। অনেক গুজব রটেছে সেতু নিয়ে। করোনা মহামারীতে যখন বিশ^ থমকে দাঁড়িয়েছে, তখনো এগিয়ে চলেছে পদ্মা সেতুর কাজ। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর আগামীকাল হবে বিজয় উৎসব।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। আমাজনের পরই খরস্রােতা নদী হিসেবে বিবেচনা করা হয় পদ্মাকে। পরিকল্পিতভাবে দুই স্তরের স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে রয়েছে চার লেনের সড়কপথ ও নিচের স্তরটিতে রয়েছে একটি একক রেলপথ। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হয়েছে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটেছে।

পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের মোট এলাকার ২৯ শতাংশ অঞ্চলজুড়ে ৩ কোটিরও অধিক মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। ফলে দেশের পরিবহন নেটওয়ার্ক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে পদ্মা সেতু বিবেচিত হচ্ছে। সেতুটিতে ভবিষ্যতে রেল, গ্যাস, বৈদ্যুতিক লাইন ও ফাইবার অপটিক কেবল সম্প্রসারণের ব্যবস্থা রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে পদ্মা সেতু যোগ হলো এক অদম্য অনুপ্রেরণার নাম হিসেবে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের চলার গতি দুর্নিবার। এর প্রমাণ আমাদের মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু হয়ে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কয়লাভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল। আমরা আগামীতেও এই অনুপ্রেরণা থেকে আরও বড় ধরনের কাজ করার সাহস পাব। এগিয়ে যাব বিশে^র সঙ্গে পা মিলিয়ে। আমরা বাঙালি। বাংলাদেশই আমাদের অহঙ্কার। বাংলাদেশই আমাদের বড় পরিচয়।

তারাপদ আচার্য্য : প্রাবন্ধিক

advertisement