advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা
স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

মোস্তাফা জব্বার
২৬ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ জুন ২০২২ ০৯:২১ এএম
মোস্তাফা জব্বার : ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী
advertisement

(দ্বিতীয় পর্ব)

(বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশের পর) আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে তার একটি সুমহান কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই যে, তিনি পিতা, মাতা, ভাই, ভাবি ও আত্মীয়স্বজনসহ পঁচাত্তরের ঘাতকদের বিচারসহ একাত্তরের ঘাতক দ্ধাপরাধীদেরও বিচার করেন। ইতিহাসে এটি এক অনন্য নজির।

advertisement

এখন থেকে বায়ান্ন বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে তার শিক্ষক প্রয়াত প্রফেসর রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো অহমিকা নেই, এখনো সে আমার ছাত্রী।’ প্রয়াত আনিস স্যারও এ কথা বলতেন। মনে হচ্ছে আমাদের এই দুই স্যারই তাদের ছাত্রী শেখ হাসিনার বাংলা বিভাগের জীবনটাকে একদমই ভুলতে পারেননি। একটি বহুল প্রচারিত ভিডিও সবারই নজরে পড়ার কথা, যেখানে প্রফেসর আনিসুজ্জামান স্যার লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হাঁটছেন আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূর্বা ঘাস দিয়ে হাঁটছেন এবং তিনিই তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের চাদরটা ঠিক করে দিচ্ছেন। এসব ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে আপনারা হয়তো লক্ষ করে থাকবেন যে, শেখ হাসিনা তার শিক্ষকদের কী গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। তার বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন, সরকার পরিচালনা, দল চালানো, পরিবার ইত্যাদি নানা বিষয়ে বইয়ের পর বই লেখা যায়। আমি এই আলোচনায় খুব ছোট করে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে তার অসাধারণ অবদানের খণ্ডচিত্র একেবারেই ব্যক্তিগত প্রেক্ষিত থেকে লিখছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৬৮ সালে। যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে প্রথম ক্লাস করি সেদিনই কাঁদানে গ্যাস খেয়েছিলাম। এর পর আইয়ুব খানের পতন পর্যন্ত সময়টা কেমন কেটেছে সেটি ঊনসত্তরের গণআন্দোলন বিষয়ে যারা ছোটখাটো খবর রাখেন তারা সবাই জানেন। আইয়ুববিরোধী সেই আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের ভিতটিকে আরও শক্ত করে তোলে। আর এই আন্দোলনে শরিক আমরা সেই এক প্রজন্ম যাদের হাত ধরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এজন্য রাজপথ আমাদের স্থায়ী বসবাসের জায়গা হয়ে যায়। তবে এমন নয় যে, আমরা ক্লাসে একেবারেই ঢুকিনি। বিশেষ করে আমরা সেসব শিক্ষককে পেয়েছিলাম যাদের ক্লাস করার জন্য অন্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা আমাদের ক্লাসে চলে আসতেন। স্মরণ করুন প্রফেসর মুনির চৌধুরী, ড. আহমদ শরীফ, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বা আনোয়ার পাশাদের কথা। আরও ভাবুন ড. রফিকুল ইসলাম, সৈয়দ আকরাম হোসেন, মনসুর মুসা ও আহমদ কবির স্যারদের কথা। এমনকি ড. আনিসুজ্জমানও আমাদের পড়িয়েছেন। অন্যদিকে তোফায়েল আহমেদ, আ. স. ম. রব, শাজাহান সিরাজ বা আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছাত্রলীগের রাজনীতির নেতৃত্ব দিতেন। পেছনে ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মনি। সবার ওপরে ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এজন্যই হয়তো রাজপথ কাঁপানো থেকে বটতলা-কলাভবনের দোতলা কাঁপানোর কোনোটাতেই আমরা পেছনে ছিলাম না। বিশেষ করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজপথ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলে আমরা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি লেখাপড়ায়ও মনোযোগী হই। তবে লেখাপড়া গৌণ এবং রাজনীতিটা তখন মুখ্য হয়েই থাকে। বরং খুব সহজেই এ কথা বলা যায় যে, ’৬৮-৬৯-৭০ সালটা আমাদের পুরোই একটি স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। তখন ছাত্রলীগ সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধের সৈনিক গড়ে তুলতে সমর্থকদের প্রস্তুত করে তোলে। একই সঙ্গে ছাত্রলীগই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে প্রস্তুত হয়। এমন উত্তপ্ত রাজনৈতিক অবস্থাতেই ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক সম্মান শ্রেণির তৃতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস করা শুরু করি।

১৯৬৮ সালের জুলাইতে অনার্সের ক্লাস শুরু করে ’৬৯-এর আন্দোলনে উত্তপ্ত হয়ে তখন আমরা কিছুটা স্বস্তিতে ছিলাম। চারদিক থেকে প্রস্তুতি চলছিল সত্তরের নির্বাচনের জন্য গ্রামের বাড়িতে অনেক কাজ করতে হবে। বাংলা বিভাগের ’৬৮ সালের ব্যাচের দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা নামক কেউ আমাদের ক্লাসে ছিলেন না। আমি বঙ্গবন্ধু পরিবারের বড় ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম ’৬৭ সাল থেকে যখন ঢাকা কলেজে পড়ি। আমাদের এক বছর পরে ঢাকা কলেজে এসে পুরো কলেজটাকে ছাত্রলীগের ঘাটি বানিয়ে ছিলেন শেখ কামাল। অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল শেখ কামালের। যে কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল সেই কলেজ হয়ে উঠেছিল ছাত্রলীগের দুর্গ। সেখানেই শেখ কামালের সঙ্গে রাজনীতি করি। মাঝখানে এক বছর বিরতির পর ’৬৯ সালে শেখ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আবার পরিচয়টা গাঢ় হয়। অবশ্য এই গাঢ়ত্বের জন্য শেখ কামালের রাজনীতির বাইরের বাড়তি গুণের কথা উল্লেখ করতে হবে। শেখ কামাল কেবল রাজনীতিপাগল ছিলেন না। তার রক্তের নেশা ছিল খেলাধুলা এবং সং¯ৃ‹তি। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, আমার লেখা এক নদী রক্ত নাটকে তিনি অভিনয় করেন। নাটকটি ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্রে মঞ্চস্থ হয়েছিল। সেই নাটকেই প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করার ধারাবাহিক কাহিনি বিধৃত হয়। সেই ’৫২ সাল থেকে ’৭১ পর্যন্ত পুরো সময়টাতে বাঙালি জাতির লড়াইয়ের ইতিহাস ছিল সেই নাটকে। তবে আমরা বাংলা বিভাগের এই ব্যাচ তখনো বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার খবরই রাখতাম না। তখন শুনেছি তিনি ইডেন কলেজের ভিপি নির্বাচন করে জিতেছিলেন।

আমাদের বাংলা বিভাগের ব্যাচটির একটি প্রধান ধারা ছিল যে, তাতে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি ছিল। তখনকার দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা সাধারণত ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন বা সমর্থন করতেন। তাদের ধারণা ছিল ভালো ছাত্র বা সুশীল ছাত্ররা ছাত্রলীগ করে না। ওরা ছাত্র ইউনিয়ন করে। সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন অনেক বেশি সম্পৃক্ত বলে মেয়েরা ধারণা করত। তাদের ধারণা ছিল ছাত্রলীগ করে গুণ্ডারা। তবে ছাত্রলীগের কাউকে আমি কোনোদিন গুণ্ডামি করতে দেখিনি। তবে আমরা ছাত্র ইউনিয়নকে হারমোনিয়াম পার্টি বলতাম। খসরু-মন্টু-সেলিম তখন ছাত্রলীগের পেশিশক্তির প্রতীক। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের হুলিয়া ছিল। কিন্তু তারা ক্যাম্পাসে- বিশেষত জহুরল হক হলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন। ওদেরকেও কাউকে কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে দেখিনি। বরং আমরা তাদের সবারই খুবই স্নেহভাজন ছিলাম। আমাদের ব্যাচের ছেলেরা বেশিরভাগই ছাত্রলীগ করতাম। আমি স্মরণ করতে পারি ছাত্রলীগের মাত্র দুজন সক্রিয় মহিলা কর্মী ছিলেন। একজন কুমিল্লার মমতাজ আপা, অন্যজন ঢাকার রোকেয়া। মমতাজ আপা মোটাসোটা ছিলেন। তার গায়ের রঙ ছিল কালো; আফ্রিকানদের মতো। রোকেয়ার মুখে ছিল বসন্তের দাগ। বোঝা যায় যে, দুজনেই দেখাশোনায় তেমন সুন্দরী ছিলেন না। আমাদের সবার চাইতে বয়স্ক মনে করে আমরা মমতাজ বেগমকে আপা ডাকতাম। রোকেয়ার মুখশ্রী সুন্দর ছিল। তবে মুখে বসন্তের দাগ ছিল বলে কেউ তার পেছনে প্রেম করার জন্য ঘোরাঘুরি করত না। ফলে ছাত্রলীগের মিটিং-মিছিল মানেই ছিলেন তারা দুজন। বিভাগে সামগ্রিকভাবে ছাত্রলীগের অবস্থান ভালো ছিল না। ফলে আমি একবার বিভাগীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করতে গিয়ে ৬ ভোটে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীর কাছে হেরে যাই। তেমন একটি সময়ে আমাদের সহপাঠিনী রোকেয়া একদিন দোতলার বাংলা বিভাগের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন যে, একজন মহিলা আসছেন যার চেহারাটা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মিলে যায়। তার হাসিভরা মুখ। গলায় সোনার চেন এবং হাতে আংটি। এমনিতেই হইচই করা রোকেয়া এই দৃশ্য দেখে পুরো বিভাগ মাতিয়ে ফেললেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ওই যে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা। আমরা তখনো ভাবিনি যে, তিনি কলাভবনের দোতলাতেই আসছেন। তিনি দোতলায় উঠলেন এবং সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বললেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার এবং বাংলা বিভাগের ৬৮ ব্যাচের পরিচয় সেদিন থেকে। এরপর তিনি বিভাগের রাজনীতিতে সিরিয়াস হন এবং আমাদের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। (চলবে)

 

মোস্তাফা জব্বার : ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলাম লেখক

advertisement