advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পদ্মা সেতু : শক্তি ও সাহসের উদ্বোধন

সামছুল আলম দুদু
২৬ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ জুন ২০২২ ০১:৫৪ পিএম
advertisement

স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাঙালির শক্তি ও সাহসের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এই সেতু বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ১৯৭১ সালে ভীষণ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সূচনা হয়েছিল, এর স্থায়িত্বকাল নিয়ে ব্যাপক সন্দেহের উদ্রেক হয়- যখন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয় সপরিবারে। স্বাধিকারের পথে মানবতার জন্য এক সর্বোত্তম বিজয় অর্জিত হয় যার নামের জাদুতে, তাকে যখন সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা করা হয়- তখন এর স্থায়িত্বকাল নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। সৌভাগ্য আমাদের, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থানের কারণে বেঁচে থাকেন। এই বেঁচে থাকার জন্যই বাংলাদেশ ও বাঙালি পথ খুঁজে পায়। তবে পথ খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

উল্লেখ্য, বিচিত্র উপাদানে গঠিত আমাদের বাঙালি সমাজের পেছনে রয়েছে হাজারো বছরের ইতিহাস। ইতিহাস সমৃদ্ধ এ সমাজকে আধুনিক ও মহান জাতিতে রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়। এ জন্য দরকার নতুন ধরন, নতুন ভাবের নর-নারী- যাদের হৃদয় গভীর আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তির দ্বারা আবদ্ধ, যারা উচ্চ-উচ্চ ভাব ও আদর্শকে কাজে পরিণত করতে সক্ষম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও দেশরত্ন শেখ হাসিনা সেই ধরনের মানুষ তৈরির শিক্ষায় যে দর্শন উপস্থাপন করেছেন, সেটিরই ফল আজকের পদ্মা সেতু। এ জন্য এই পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলার সব মানুষ উৎসাহ ও উদ্দীপনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু এক বিস্ময়কর সাফল্য।

advertisement

বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজনৈতিক নানা ঘটনা পরম্পরায় জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়। তিনি সততা ও দক্ষতার সঙ্গে মহান দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে নতুন করে পরিচিত করেছেন বিশ্বদরবারে। তার কর্মকুশলতায় মহত্বের ভার বহনে সামান্যতম ব্যত্যয় ঘটেনি। পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল রাজনৈতিক অঙ্গীকার। প্রথম দিকে বিশ্বব্যাংকের টাকা, জাইকা এবং এডিবির অর্থায়নে পদ্মা সেতুর প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু নানা ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে গৌরবোজ্জ্বল এ প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অন্যরাও একই পথে হাটে। আন্তর্জাতিক ১৬টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই সেতু নির্মাণের দরপত্রে অংশগ্রহণ করলেও সবাই রণে ভঙ্গ দেয় বিশ্বব্যাংকের কারণে। প্রকল্পের কাজ স্থগিত হয়ে যায়। ২০১০ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের সাহসী ঘোষণা দেন। এতে উজ্জীবিত হয়ে উঠে গোটা বাঙালি জাতি। কিন্তু তখনো দেশের কতিপয় অর্থনীতিবিদ পদ্মা সেতু নির্মাণ অসম্ভব বলে মন্তব্য করেন। কেউ কেউ অর্থনীতির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে। পদ্মা সেতু নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। বিশ্বব্যাংক কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ এনে প্রকল্পে অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানায়।

মূলত এ দেশীয় কতিপয় ষড়যন্ত্রকারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু নির্মিত হোক, তা কখনো চায়নি। তাদের প্ররোচনায় বিশ্বব্যাংক সরে যেতে বাধ্য হয়। ষড়যন্ত্রকারীদের একজন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের নাম সামনে চলে আসে। জানা গেছে, ড. ইউনূসের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের তদানীন্তন ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের পরম সখ্য ছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ থেকে বিধি মোতাবেক তাকে সরিয়ে দেওয়ার কারণে তিনি ভীষণ চটে যান। বিশ্বের প্রভাবশালী ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের সঙ্গেও ড. ইউনূসের গভীরতম সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশ্বব্যাংক কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের অন্যতম একজন সুদখোর ব্যক্তি হিসেবে ইউনূসের খ্যাতি সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানেন। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের দুর্নীতি বিষয়টি কানাডার আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ওই আদালতে প্রমাণিত হয়, দুর্নীতির অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মনগড়া ও ষড়যন্ত্রের অংশ। দুর্ভাগ্য যে, ভিত্তিহীন অভিযোগ মাথায় নিয়ে তদানীন্তন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সেতু সচিবসহ কয়েকজনকে পদত্যাগ করতে হয়। তবে যোগাযোগমন্ত্রীসহ যারা পদত্যাগ করেছিলেন পদ্মা সেতুর স্বার্থেইÑ যাতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক পুনরায় অর্থায়ন করতে এগিয়ে আসে, এ জন্যই তাদের পদত্যাগ।

পদ্মা সেতু জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্ব ও দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণেই নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা বহন করে এগিয়ে যাচ্ছে। সহসাই উন্নত দেশের তালিকায় স্থান পাবে। পদ্মা সেতু তার সূচনা উপাত্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এটি আমাদের জাতীয় জীবনের উজ্জ্বলতম একটি দিক। জননেত্রী শেখ হাসিনার গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনার অনবদ্য ফলগুলো আমাদের আগামী দিনের চলার পথে প্রেরণা জোগাবে।

পদ্মা সেতু আমাদের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ সেতু মাইলফলক। প্রমত্ত পদ্মার ওপর এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি মনোজগৎকে আরও বড় করবে। আশার আলো জেগে উঠছে প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়েÑ আমরাও পারি। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এর ক্ষতিসাধনে হয়তো তৎপর থাকবে সব সময়। এ জন্য আমাদের সাবধান থাকতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যেভাবে পরিকল্পনামতো অগ্রসর হন, এতে কোনো বাধা এলেও থেমে থাকেন না। উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে একটি আদর্শ থাকা চাই- যে উদ্দেশ্য একটি জাতিকে চালিত করতে পারে। ওই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবেইÑ সেটি আজ প্রমাণিত। আমদের জাতীয় শক্তি ও উদ্দেশ্যগুলো একটি সুস্থ পথনির্দেশ পেয়ে সৃজনশীল ও গতিময় হয়ে উঠবে। শুরু হবে দৃঢ় পদবিক্ষোভ বাংলাদেশের জয়যাত্রা। উদ্দেশ্যের নিশ্চিন্ততা ও দৃষ্টির স্বচ্ছতার জন্যই মহৎ কর্মগুলো বাস্তবে রূপলাভ করেছে।

আজকের এই সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে পদ্মা সেতু। আমাদের নাগরিকত্বে জাতি, সম্প্রদায়, পেশা, নারী, পুরুষ, এমনকি সামাজিক পদমর্যাদাতেও কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক মর্যাদা লাভ করেছি। আমরা এখন আর আমজনতা নই। আমরা নাগরিক হয়ে উঠেছি। পদ্মা সেতু ওই বোধটিই জাগিয়ে তুলেছে। আমাদের ব্যক্তিত্বের মৌলিক ও অপরিহার্য পরিচয় হচ্ছে আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। পদ্মা সেতু নাগরিক মর্যাদার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। কর্মক্ষেত্রে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য সত্ত্বেও মূলত আমরা প্রত্যেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে গৌরবের অংশীদার হতে পেরেছি। ওই পথ জননেত্রী শেখ হাসিনাই তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা আর পিছিয়ে থাকব না।

পদ্মা সেতু কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। এখানে আমরা সবাই বিনিয়োগ করেছি। ঐক্যবদ্ধ বিনিয়োগের ফসল এই পদ্মা সেতু। বিনিয়োগের সফল বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশরত্ন ও জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাই এ কোনো স্থাপনার উদ্বোধন নয়, শক্তি ও সাহসের উদ্বোধন। আমরা এগিয়ে যাব ক্ষিপ্রগতিতে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। অন্য কোনো সাধারণ নেতার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব হতো না।’ এই সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

 

সামছুল আলম দুদু : রাজনীতিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য

advertisement