advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিক্ষায় এমন পক্ষপাতিত্ব আর কত চলবে

জোবাইদা নাসরীন
২৭ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ জুন ২০২২ ০৮:১৪ এএম
ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
advertisement

‘বিত্তশালী বাবার একমাত্র মেয়ে সেজুতি এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়ে প্যান্ট-শার্ট পরে আধুনিক ভাব ধরে ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার বখাটে যুবকরা প্রায়ই তাকে অশালীন কথাবার্তা বলে উত্ত্যক্ত করে। এ ব্যাপারে বাবার কাছে সেজুতি অভিযোগ করলে বাবা বলল, ‘তুমি শালীনভাবে চলাফেরা করো। কেউ তোমাকে কিছু বলার সাহস পাবে না’। না, এটি কোনো পারিবারিক কথোপকথন নয়, এটি বাংলাদেশের একটি স্কুলের দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের সৃজনশীল অংশের প্রশ্নের একটি ভাগ। এখানেই শেষ হয়নি, এর পরের অংশে আছে প্রশ্ন। গ নম্বর প্রশ্নটি করা হয়েছে এভাবে- ‘অশালীন পোশাকের কারণে অধিকাংশ ইভটিজিং হয়ে থাকে। উদ্দীপকের আলোকে ব্যাখ্যা করো।’ পাঠক খেয়াল করুন এর পরের প্রশ্নটিও। ঘ নম্বর প্রশ্নটি ছিল- ‘সেজুতির বাবার কথার মূল্যায়ন করো’; যার অর্থ হলো শালীনভাবে চলাফেরা করলে কেউ কিছু বলার সাহস পাবে না।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো স্কুলটি নতুন কিংবা অজপাড়াগাঁয়ের নয়। ওই স্কুলটিরও রয়েছে যথেষ্ট খ্যাতি ও কদর। হ্যাঁ, এটি ঘটেছে এই সময়কালে রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে পড়াশোনা করাটা অনেক শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের জন্য খ্যাতি এবং মর্যাদার। এটি নিঃসংকোচে বলা যায়, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের শিক্ষা প্রদান শুধু যে শিক্ষানীতিবিরোধীই, তা নয়। প্রশ্নে এ ধরনের বিষয়ে অবতারণা করা মানেই ওই প্রতিষ্ঠান পাঠদানে এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের পড়ায়। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে পাঠ করলে আমরা মহাভুল করব। কারণ শুধু যে পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই লিঙ্গীয় রাজনীতির পাঠ থাকে, তা নয়। যারা পাঠদান করেন, তাদের মধ্যেও চরম নারীবিদ্বেষ ও পোশাকের মধ্য দিয়ে নারীকে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির গভীর চর্চা হয়। সেটি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে শিক্ষক এ প্রশ্নটি করেছেন, তিনিও বিচ্ছিন্ন কেউ নন। তিনিও সমাজের মতাদর্শ লালন করেন এবং এরই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন এই প্রশ্নে।

advertisement

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কী সমাজের চিন্তাধারার বাইরে চলবে? শিক্ষক হিসেবে এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমরা প্রায়ই হই। শিক্ষকরা কী সমাজে চর্চিত বিষয়ে কিংবা বিশ্বাস নিয়েই শিক্ষার্থীদের শেখাবেন? যদি সেটিই হয়, তা হলে তো শিক্ষার্থীরা সেটি সমাজ থেকেই শিখে নেয়। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরকার কী? শুধু কি সনদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আজ কী? শিক্ষকদের আসলে দায়িত্ব কী? নৈতিক শিক্ষা কি আসলে ব্যক্তিগত বিশ্বাসজনিত শিক্ষা? এই নৈতিক শিক্ষা আদতে কী? ধর্মই কী একমাত্র নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি? এগুলো নিয়ে আমরা কখনো প্রশ্ন তুলি না, কখনো কথা বলি না। এর পেছনের কারণ হলো জারি থাকা ভয়। আমরা সব সময় ভয়ে থাকি এই ধরনের প্রশ্ন তুললে আবার কখন কী হয়?

শালীনতাই বা কী? কার কাছে কী শালীন, সেটি কে মাপবে? কীভাবেই বা মাপবে? আজ থেকে ৪০ বছর আগে বাংলাদেশে বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চলের নারীরা ব্লাউজ কিংবা পেটিকোট পরতেন না। কই তখন তো তাদের অশালীন কেউ বলত না? কিংবা সমাজের নারী নির্যাতনের সঙ্গে নারীর শালীন পোশাকের সম্পর্ক কেউ খোঁজেনি। তা হলে এখন কেন এটি খুঁজতে হচ্ছে। শুধু খোঁজাই নয়, বরং এটির জন্য নারীর পোশাককেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী করা হচ্ছে। কেন এই ৪০ বছরে বাংলাদেশে এই পরিবর্তন? এটি না জানলে, না বিশ্লেষণ করলে শুধু আলাদা করে দেখে জনগণকে খুশি করতে সেই শিক্ষককে শোকজ করলেই এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না- এমন হলফ করে বলা কঠিন; বরং এ রকমই হয়তো অনেক স্কুলেই চর্চা করা হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশ্নটি প্রচারে আশায় হয়তো আমরা ধরেই নিচ্ছি, এখানেই এ ধরনের চর্চা হয়।

ওই মনস্কতার পেছনে অনেক ধরনের রাজনীতি কাজ করে। প্রথমত, ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের কারণে আমাদের কাছে নৈতিক শিক্ষা বা ‘শালীনতা’র বিষয়গুলো ধর্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তবে এখানে এ বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে- সমাজের কাছে শালীনভাবে চলাফেরা করা তনু, নুসরাতরাও ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল। তাই এটিও পরিষ্কার যে, ‘শালীনতা’র সঙ্গে নারী নিপীড়ন ও যৌন হয়রানির কোনো সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয় যে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করতে চাই, তা হলো- এই ৪০ বছরে বাংলাদেশে নারীরা অল্পকিছু মাত্রায় হলেও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করেছেন। এ ক্ষেত্রে হয়তো নারীকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণের দাওয়ায় কিছুটা হেরফের হচ্ছে। এ জন্য পুরুষ কৌশল হিসেবে বেছে নিচ্ছেন নারীর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়গুলোকে। এর মধ্যে একটি হলো পোশাক। ধারণা করা হয়, এটিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়েই নারী নিয়ন্ত্রিত হবে সবচেয়ে বেশি। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নারীর পোশাক কেন্দ্র করে নিয়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে নরসিংদী স্টেশনে এক নারীকে তার পছন্দের পোশাক পরার কারণে হেনস্তা করা হয়। শুধু তা নয়, প্রতিনিয়তই রাস্তাঘাটে নারীরা নানা ধরনের যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন কেবল পছন্দ ও স্বচ্ছন্দপূর্ণ পোশাক পরার কারণে। সমাজে নারীকে নিয়ন্ত্রণের এই কৌশল দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন সেই প্রশ্নকর্তা শিক্ষক।

দেখা যাচ্ছে- নারীর ‘শালীন’ পোশাক এবং চলাফেরা নিয়ে কথাবার্তা ও যৌন হয়রানিমূলক বক্তব্য যে শুধু পুরুষরাই দিচ্ছেন, তা নয়; নারীরাও বলছেন। কারণ এই সমাজে পুরুষের মতাদর্শই প্রচার করেন বেশিরভাগ নারী। এখন আমাদের সজাগ থাকা জরুরি। শিক্ষা খাতে এই ধরনের মতাদর্শের প্রচার ও পাঠদান আমাদের জন্য কতটা ক্ষতি বয়ে আনচে, এর হিসাব করা। এর আগে একবার বর্ণমালা শিক্ষায় ‘ও’-তে ‘ওড়না’ উদাহরণ হিসেবে আনায় সমালোচনা হয়েছিল। পরে সেটি পরিবর্তন করা হয়। শিক্ষা একটি বিশেষ খাত। এখানে ব্যক্তিক মতাদর্শ প্রচারের সুযোগ কম গ্রহণ করাই মঙ্গলজনক। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন। কিন্তু ওই পরামর্শে যেন কোনো ধরনের সংস্কারজাত পক্ষপাত না থাকে, এ বিষয়ে আমাদের সচেতনতা খুবই জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমি এটি ভাবি বা চিন্তা করি। সবাই একই রকম ভাববেন না। তাই কোনটি ‘শালীন’, সেটি আমি নির্ধারণ করতে পারব না বা করাও ঠিক হবে না। আর এই ধরনের প্রচেষ্টা শিক্ষা খাতকে অনেকখানিই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সমাজকে এগিয়ে নেয় শিক্ষা। কিন্তু পক্ষপাতমূলক শিক্ষা অনেকটাই পিছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে, এ পেশার দায় ও দায়িত্ব- দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ পেশার সঙ্গে সংযুক্ত কারও কাছ থেকে কোনো রকম বিদ্বেষপূর্ণ কিছু কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও এই বিষয়ে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কারও প্রতি অসম্মান, হেয় করা, পক্ষপাতিত্বমূলক কোনো আচরণ ও ভূমিকা গ্রহণ না করা এবং করলে কী ধরনের শাস্তি হবে- সেটিও উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। কারণ একটি দেশে শিক্ষাব্যবস্থাই যদি পক্ষপাতমূলক হয, তা হলে সেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্যই তো অর্থহীন।

 

ড. জোবাইদা নাসরীন : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement