advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভরে উঠুক পদ্মা সেতুর গৌরব

অজয় দাশগুপ্ত
২৭ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ জুন ২০২২ ০১:১০ এএম
advertisement

একজন আত্মপ্রত্যয়ী নেতার দরকার ছিল আমাদের। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন সব মানুষের জয়জয়কার- যারা নেগেটিভ। তারা কোনো কিছুই সহজভাবে নিতে পারে না। এমনকি দেশের সুনাম নিয়েও তারা ভাবে না। দুনিয়ার কোনো দেশে এমনটি দেখবেন না। এই যে ভারত, পাকিস্তান- এ দুই দেশ নিয়ে বাদ-বিসংবাদ ও আলাপ-আলোচনা তাদের দেশের মানুষ নিজেদের মান সম্মান নষ্ট হোক, এমন কোনো কাজ করে না। স্বাধীনতার পর থেকে একশ্রেণির বাঙালির বিকৃত মানসিকতা দিন দিন বেড়েছে ছাড়া কমেনি। বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে আমি নবম দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। সবকিছু মনে আছে আমার। চারদিকে হঠাৎ এমন সব আগাছা আর ডালপালা গজিয়ে গেল- যেন দেশ স্বাধীন করাটাই ছিল অপরাধ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেখেছি আমি। সাধারণ মানুষের মনে যাই থাকুক, সেদিন আওয়ামী লীগ ছিল অসহায়। নেতাদের বেশিরভাগই হয়ে গিয়েছিল মোশতাকের হাতের পুতুল। ওই আমলটায় নেতৃত্ব ধ্বংস করার জন্য মরিয়া দালাল শ্রেণি আজও দমেনি। বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা হত্যার মাধ্যমে দেশকে পাকিস্তানের ছায়ারাষ্ট্র বানানোর অপচেষ্টা সার্থক হয়নি। তারা ভাবতেও পারেনি আওয়ামী লীগ ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়াতে পারে। তারা ভাবেনি বঙ্গবন্ধুকন্যা এই দেশ শাসন করে বাংলাদেশকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাবেন- যা অভূতপূর্ব।

আজকের বাংলাদেশ শেখ হাসিনার পরিশ্রম আর একক নেতৃত্বের ফসল- যা অনেক অর্জনে সমৃদ্ধ। এই অর্জনগুলোর সেরা একটি অর্জন পদ্মা সেতু। এটি এঁকে নেবে কত কাণ্ড, কত ঘটনা! চর্বিত চর্বনে যাওয়ার দরকার নেই। যখন এই লেখা লিখছি সিডনি, তখন বসেই টিভিতে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন দেখলাম। পুরোটা দেখেছি। নিঃসন্দেহে এমন কনফিডেন্সের ভিত্তিই হচ্ছে সাহস আর কর্মকাণ্ডের ফলপ্রসূ পরিণাম। শেখ হাসিনা যে প্রাজ্ঞ আর পরিণত, তা তার দুশমনও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি একেক করে যেসব মানুষের কথা তুলে ধরেছেন, তাদের আমরা চিনি। তাদের সবাই কমবেশি বিখ্যাত। তাদের যে অবদান নেই- এ কথা বলব না। কারও কারও মেধা প্রশ্নাতীত, কেউ কেউ যুক্তিবাদী, কেউ তুখোড় বক্তা। কেন জানি তাদের সবাই কোনো না কোনো কারণে পদ্মা সেতু বিষয়ে ছিলেন তর্কমুখর। তাদের সন্দেহ, সংশয় বা আপত্তি থাকতেই পারত। কিন্তু তাদের অনেকেই বিএনপির নেতাদের সস্তা কথার চেয়েও নিম্নমানের সমালোচনা করেছিলেন।

advertisement

শেখ হাসিনা কিছুই ভোলেন না। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ মনে রাখার ক্ষমতা। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি নোট করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সবকিছু। প্রতিটি মন্তব্য আর সংশয় শুনে এখন হাসি পাবে মানুষের। মনে হবে, তারাই কিনা বুদ্ধিজীবী? ঘটনাটি যদি পেছন ফিরে দেখি- ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকায় পদ্মা বহুমুখী সেতু সংশোধিত নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। এর আগেই নিশ্চিত করা হয় ঋণদাতাদের প্রতিশ্রুতি। এডিবি প্রধান উদ্যোক্তা হলেও সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ‘লিড ডোনার’ হিসেবে যুক্ত হয় বিশ্বব্যাংক। মোট নির্মাণ ব্যয় ২৯১ কোটি ডলারের মধ্যে ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বিশ্বব্যাংক। এডিবি ৬১ কোটি ৫০ লাখ, জাইকা ৪১ কোটি ৫০ লাখ, আইডিবি ১৪ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। বাকি অর্থ সরকার দেবে বলে ঠিক হয়েছিল। ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল পদ্মার বুকে ভাষাশহীদ বরকত ফেরিতে হয় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে আসা সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনগোজি ওকোনজো ইউয়েলা বলেন, বাংলাদেশের স্বপ্নে অংশীদার হতে পেরে তারা ‘গর্বিত’। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তির পরও অর্থায়ন ছাড় হচ্ছিল না এবং কাজও শুরু করা যাচ্ছিল না। এর পর পরই শুরু হয়ে যায় ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বললেন, নোবেলজয়ী ড. ইউনূসই ছিলেন এর নেপথ্য হোতা। প্রধানমন্ত্রীর কথায়- সামান্য এমডি পদের জন্য দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তিনি। তার সঙ্গে ছিল বিএনপির নেতাদের মদদ। মন্ত্রী আবুল হোসেনকে বরখাস্ত করাসহ বিশিষ্ট সব মানুষকে জেল খাটতে হয় এক ষড়যন্ত্রে। কিন্তু শেখ হাসিনা দমেননি। পরের ঘটনা সবাই জানেন, বিশ্বব্যাংক মুখ ফেরালেও তিনি স্পষ্ট করে জানান- নিজেদের অর্থায়নে করা হবে সেতু। পরে চীনের সহায়তা আর পরামর্শে তাদের যোগ্য কর্মপ্রবাহে সমাপ্ত হয়েছে এই সেতুর কাজ। প্রধানমন্ত্রী ভারত, হংকং, থাইল্যান্ডসহ এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশের মানুষের অংশগ্রহণের কথাও নিশ্চিত করেন। এত বড় কাজটি হচ্ছিল। অথচ আমাদের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা তা টের পেলেন না।

এই প্রবণতা আসলে কী বলে? রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক বা গভর্নরজাতীয় সব মানুষ কি না বুঝে কথা বলেন? তারা কী বুঝেছিলেন জানি না। তবে উদ্ধৃতিগুলো শুনে মনে হলো, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিরোধিতা। আওয়ামী লীগের এই এক দুভার্গ্য। তারা বিরোধী দলে থাকলে যাদের সমর্থন পায়, সরকারে এলে তারাই শুরু করে বিরোধিতা। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী যাদের নাম বলেছেন, তারা সব সময়ই টক শো বা আলোচনায় সরকারবিরোধী। তাদের কথার ভিত্তি যাই হোক, একটি সাবধান বাণীও কাজে লাগেনি; বরং মনে হয়েছে, তারা আছেন ইনফরমেশন গ্যাপের অন্ধকারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই বিরোধিতা? পদ্মা সেতু হলে কার লাভ, কার লোকসান? কেন তা হলে এ ধরনের অন্ধ আক্রোশ? আমাদের গুণীরা ভুলে যান, এভাবে আবোলতাবোল কথা বললে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়। মানুষের বিশ্বাস আর আস্থার কারণেই তারা বুদ্ধিজীবী। এ জায়গাটি না বুঝলে বা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করলে সময় তাদের ছেড়ে কথা বলবে না। এই যে প্রধানমন্ত্রী খোলামেলা তাদের বক্তব্য পড়ে শুনিয়ে দিলেন, এতে একদিকে যেমন তার বিজয় ও স্বচ্ছতা বড় হয়ে উঠল- আরেকদিকে তেমনি তাদের মান নেমে গেল নিচে। মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করে কেউ দেশপ্রেমী হতে পারে না। আমার আবেদন থাকবে, মানুষ বিভিন্ন সময় নানা পরিবেশে তখনকার মতো করে কথা বলে। এতে হয়তো ভুলভ্রান্তি থেকেই যায়। কিন্তু বুদ্ধিমান বা অগ্রসর মানুষ মাত্রই তা স্বীকার করে শুদ্ধতায় ফেরেন, নিজেকে আরও বড় করে তোলেন। দেশ ও জনগণের স্বার্থে এমন কিছু আশা করা কি অন্যায় হবে?

সবাই পদ্মা সেতু পার হবেন। সবাই তার বুকে চড়ে এপার-ওপার করবেন। এর সেবা সবার জন্য। এই বিজয়, এ কৃতিত্বও সবার। বঙ্গবন্ধুকন্যা সমালোচকদের জবাব দিয়েছেন আবার তাদের দাওয়াতও পাঠিয়েছেন। এখন সবার অংশগ্রহণে ঐক্যে ভরে উঠুক পদ্মা সেতুর গৌরব। আর নেতা শেখ হাসিনা, আপনার জন্য সিডনির টুপি খোলা স্যালুট।

 

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক, সিডনি

advertisement