advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধার করে সঞ্চয় ভেঙে চলছে সংসার

জিয়াদুল ইসলাম ও রেজাউল রেজা
২৮ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৮ জুন ২০২২ ০৯:২৬ এএম
advertisement

রাজধানীর বসিলা এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন পান। বাসা ভাড়া, সেবার বিল, খাদ্য ও পরিবহন খরচের পেছনেই বেতনের টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে তার। এরপর চিকিৎসাসহ অন্যান্য ব্যয়ের জোগান দিতে প্রায় প্রতিমাসেই বন্ধুবান্ধব ও আত্মীস্বজনের কাছে হাত পাততে হয়। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, দুই বছর পর এ বছর বেতন এক হাজার টাকা বেড়েছে, কিন্তু খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। লকডাউনের সময় জমানো টাকা খরচ হয়ে গেছে। আগে প্রতিমাসে কষ্ট করে হলেও এক হাজার টাকা করে ব্যাংকে জমাতাম। এখন সেটাও হচ্ছে না। উল্টো প্রায় আমাকে সংসার চালাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে।

আবার করোনাকালে ব্যবসায় টানা লোকসানে পুঁজি হারিয়ে অনেক আগেই নিঃস্ব হয়েছেন গুলিস্তানের ট্রেড সেন্টারের পোশাকের পাইকারি ব্যবসায়ী দুলাল হোসেন। নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করাতে বড় অঙ্কের ঋণ করতে হয়েছে তাকে। দুলাল আমাদের সময়কে বলেন, করোনায় সব শেষ; সঞ্চয় বলতে আমার এখন কিছুই নেই। এবারের ঈদ থেকে ব্যবসাটা আবারও চালু হয়েছে। কিন্তু যা আয় হয় তার থেকে খরচ অনেক বেশি। নতুন করে সঞ্চয়ের কথা ভাবতেও পারি না। ঋণ কিভাবে পরিশোধ করব তাই ভাবি। দুশ্চিান্তও হয়, করোনা যদি আবারও হানা দেয়, তা হলে কী হবে।

advertisement 3

চাকরিজীবী ও

advertisement 4

ব্যবসায়ীদের মতো মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন রিকশাচালক সুজন সরকারও। তিনি বলেন, আগে সমিতিতে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে জমাতেন। এখন তা আর পারেন না। আগে খরচ বাঁচাতে দুপুরে বনরুটি, কলা আর চা খেয়ে থাকতেন। এখন তাতেও খরচ বাড়ছে। অবস্থা এমনই যে কলা খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে আর টাকা জমানো সম্ভব নয়। রিকশা চালিয়ে যা আয় করছেন তা দিয়ে সংসার আর চলছে না। মাসুদ রানা, দুলাল হোসেনদের মতোই একই অবস্থা এখন দেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের। আবার সুজন সরকারদের মতো নিম্নবিত্তদের অবস্থা আরও খারাপ। করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে এখন চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছেন এসব মানুষ। সীমিত আয়ে জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ কুলিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। করোনাকালের কম আয়ে সংসারের ব্যয় সামাল দিতে অনেক আগেই অনেকের সঞ্চয়ের টাকা ফুরিয়ে গেছে। বর্তমানে অনেকের আয় স্বাভাবিক হলেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পেরে উঠছেন না। নতুন করে সঞ্চয় দূরের কথা, উল্টো ঋণ করতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় আগামী মুদ্রানীতিতে উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা চিন্তা না করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই বাংলাদেশ ব্যাংককে বেশি নজর দেওয়ার পরামর্শ দেশের অর্থনীতিবিদদের। বৃহস্পতিবার নতুন এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরে‌ (বিবিএস) হিসাব বলছে, গত মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার গিয়ে ঠেকেছে ৭.৪২ শতাংশে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ ২০২১ সালের মে মাসে যে পণ্য ও সেবা পেতে ১০০ টাকা খরচ হয়েছিল, চলতি বছরের মে মাসে সেই পণ্য ও সেবা কিনতে ১০৭ টাকা ৪২ পয়সা খরচ করতে হয়েছে মানুষকে। এ সময়ে খাদ্যপণ্যের জন্য মানুষকে খরচ করতে হয়েছে আরও বেশি টাকা। কারণ মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নতুন রেকর্ড গড়ে ৮.৩০ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ অতিমারীর পর অতি মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে দেশের সাধারণ মানুষ। ফলে মানুষের শুধু প্রকৃত আয়ই কমেনি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসল টাকাও ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার সঞ্চয় ভেঙে খেতেও বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগেও খরা চলছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে গরিব মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। তাই এখন উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা চিন্তা না করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই প্রাধান্য দিতে হবে। বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সঞ্চয় কমে যাওয়া থেকেই প্রকাশ পায় মানুষ ভালো নেই। একদিকে করোনায় আয় কমেছে, অপরদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যয় কুলাতে পারছে না। অন্যদিকে যারা এখনো সঞ্চয়ে সক্ষম, তারাও ব্যাংকে যে সুদ পাচ্ছেন তাতে খুব একটা পোষাচ্ছে না। কারণ প্রকৃত সুদ ৬ শতাংশেরও কম, অথচ মূল্যস্ফীতি প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। মানুষ ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয়ে আগ্রহ হারালে সেটা ব্যাংক খাতের জন্য ভালো হবে না। মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্য, নিম্ন ও খেটে খাওয়া মানুষ কষ্টে আছেন। তাই মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা লাঘব করতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সম্প্রসারণ করতে হবে খোলাবাজারে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম। বিদ্যুৎ, জ¦ালানির দাম যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন।’

করোনা মহামারীর মধ্যেই ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করা হয়। এরপর থেকেই আমানতের সুদহার ব্যাপক হারে কমতে শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমানতকারীদের সুরক্ষায় ২০২১ সালের আগস্টে মেয়াদি আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম দেওয়া যাবে না বলে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের তিন মাসের গড় মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিতে বলে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে আমানতকারীদের সুদ দেওয়ার নির্দেশনা মানছে না অধিকাংশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সর্বশেষ মে মাসে দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংকের গড় আমানতের সুদ দাঁড়িয়েছে ৪.০২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে গড়ে ৪ টাকার কিছু বেশি সুদ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এই সুদ থেকে সরকারের উৎস কর, আবগারি শুল্কসহ নানা রকমের চার্জ কাটা হচ্ছে। ফলে ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃত অর্থে কোনো মুনাফা বা সুদ ঘরে তুলতে পারছেন না আমানতকারীরা। তুলনামূলক কম সুদ ও সংসাদের খরচ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকেও আমানত আসা কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে করোনা মহামারীর আঘাত আসার আগে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্ষিক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.৮২ শতাংশ। সেই প্রবৃদ্ধি বাড়তে বাড়তে গত বছরের মে মাসে সর্বোচ্চ ১৪.৪৭ শতাংশে ওঠে। কিন্তু এরপর থেকেই টানা কমছে আমানতের প্রবৃদ্ধি। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯.০১ শতাংশ। আর গত ফেব্রুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন ৮.৭৪ শতাংশে নেমেছিল।

জানা গেছে, নিম্ন মধ্যবিত্ত, সীমিত আয়ের মানুষ, নারী, প্রতিবন্ধী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন প্রকল্প চালু রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা (সুদ) দেয় সরকার। কিন্তু নানা কড়াকড়ি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিও কমে গেছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সর্বশেষ নভেম্বর মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬৩৮ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৮ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট লক্ষ্য রয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘মানুষের আয়ের চেয়ে এখন ব্যয় অনেক। বৈশি^ক কারণেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এখন অভ্যন্তরীণ নীতিতে তা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। তবে মূল্যস্ফীতিতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের কষ্ট লাঘবে নানা ধরনের সহায়তা করা যেতে পারে। পরিধি ও বরাদ্দ বাড়ানো যেতে পারে টিসিবি এবং ওএমএসের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার।’ তার মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো গেলে মানুষের সঞ্চয় বাড়বে।

 

 

 

 

advertisement