advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সেতু হোক সেতুবন্ধের

অঘোর মন্ডল
২৮ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৮ জুন ২০২২ ১০:১১ এএম
অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক
advertisement

পদ্মার ঢেউয়ের চেয়ে বাঙালির আবেগের ঢেউ আরও ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক। পদ্মা সেতু ঘিরে ওই আবেগ আছড়ে পড়ছে দেশজুড়ে। এত বড় স্বপ্ন জয়ের পর যদি আবেগই কাজ না করে, তা হলে ওই জয়কে পানসে ও ম্যাড়মেড়ে মনে হবে।

পদ্মা সেতু বাঙালির আবেগের সেতু। পদ্মার চেয়ে বড় নদীর ওপর বড় সেতু পৃথিবীতে আরও আছে। কিন্তু এই সেতুর যে ইতিহাস, তা আগামী প্রজন্মের জন্য পাঠ্যবইয়ে জায়গা পাওয়া উচিত। স্টিল-কংক্রিট-রড-সিমেন্ট-বালুতে গড়া শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এই সেতু বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা-সার্মথ্য আর অহঙ্কারের প্রতীক! উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী তেমন একটি বার্তাই দিয়েছেন। প্রমত্ত-খরস্রােতা-সর্বনাশা পদ্মার ওপর সেতু শুধু নদীর দুই কিনারকে এক করেছে, তা নয়। এই সেতু শুধু আগামীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলছে, তাও নয়। এই সেতু বাঙালিকে পেছন ফিরে দেখতে বলছে, ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে বলছে। জাতি হিসেবে আমাদের একটি খারাপ অভ্যাস আছে। আমরা ইতিহাসের শুধু পছন্দের অংশটুকু নিয়ে নাড়াচাড়া করি। নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করি। ইতিহাসবোধহীন জাতি হিসেবে আমরা বহুবার এই প্রমাণ রখেছি। এই ইতিহাসবোধহীন অগভীর মানুষের মধ্যে শুভবুদ্ধির চর্চা বৃদ্ধি করা এখন জরুরি। বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হলে এর পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভব। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এর বড় প্রমাণ। একটা স্বাধীন স্বদেশ পাওয়ার স্বপ্নে সেদিনও বাঙালির ভাবাবেগ তুঙ্গে ছিল। একই সঙ্গে ওই স্বপ্নকে নষ্ট করতে কতিপয় মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। অনেক মানুষ অপশক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। জাতিগত নয়, ব্যক্তিস্বার্থে। পদ্মা সেতুর ইতিহাসের পাতাতেও তেমন কিছু লেখা থাকবে। সেগুলো জানা না থাকলে পরের প্রজন্ম স্বপ্ন দেখতে পারবে না। সামনের দিকে এগিয়ে চলার সাহস পাবে না। গত ২৫ জুন এই বাংলায় জন্ম নেওয়া হাজারো শিশু ঠিক ২৫ বছর পর পদ্মা সেতুর ইতিহাস পড়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে হয়তো ভাববে- এও সম্ভব! ইতিহাসবিমুখতায় স্বাধীনতার একান্ন বছর পরও একাধিক প্রজন্ম বুঝতে পারে না, এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতায় বিদেশিদের সঙ্গে এ দেশের অনেক মানুষও সক্রিয় ছিল!

advertisement

একাত্তরেও এ দেশের জেগে ওঠা মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে পদ্মার কথা। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ‘তোমার-আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।’ তাই পদ্মা শুধু একটি নদী নয়, এটি বাঙালির একটি ঠিকানা। পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এটি এখন বাঙালির ভাবাবাগের আরেক নাম। আর ওই আবেগ রাজনীতি-অর্থনীতি-বিশ্বব্যাংকের মোড়লগিরি- কোনো কিছু দিয়ে দাবায়ে রাখা যায় না। তবে হ্যাঁ, পদ্মা সেতুর মধ্যেও রাজনীতি আমরা খুঁজে পাই। ওই রাজনীতি আমাদের নতুন বার্তা দিয়ে যায়, ‘বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখার।’

বাংলাদেশ পারে- এই আত্মবিশ্বাস আর আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সেতু অনুচ্চারে অনেক কথা বলে যায়। এই সেতু নিয়ে রাজনীতি আর অর্থনীতির অনেক খেলা হয়েছে। এর কতটাই বা আমরা জানি! কিন্তু ওই অপরাজনীতি আর ‘ফাউল প্লে’র লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল করে রাখা। সেটি অর্থনৈতিভাবে। তাই পদ্মা সেতু হচ্ছে- বিদেশি ঋণ, আর্থিক সাহায্য দয়ার ওপরে নির্ভরতা থেকে মুক্তির প্রতীক। কারণ এই সেতু তৈরি হয়েছে আমাদের টাকায়, বাংলাদেশের মানুষের নিজের অর্থে। খরস্রােতা পদ্মা এতদিন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে অন্য অংশের দূরত্ব তৈরি করে রেখেছিল। ওই দূরত্ব ঘুচে গেল। পদ্মা সেতু একই সঙ্গে একটি উন্নয়নের প্রতীক, এগিয়ে চলার স্মারক আর দেশজভাবে পিছিয়ে পড়া এলাকায় উন্নয়নের সুফল ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস। এটি নিছক একটি সেতু নয়, এ এক নতুন সেতুবন্ধনও বটে। পদ্মা সেতু পদ্মাপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে দিচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্টাতে হবে নিজেদের চিন্তার ধাঁচ। ‘আমরা পারি’- এই চিন্তা করার অভ্যাসটি বৃদ্ধি করতে পারলে আমাদের পক্ষে অনেক প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। হীনম্মন্যতা আর আক্ষেপ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনালেখ্যে জায়গা পাক আত্মবিশ্বাস; সৃষ্টিশীলতা নিয়ে বেঁচে থাকার মৌলিক বাসনাই প্রাধান্য পাক।

অর্ধশতক পেরিয়ে আসা বাংলাদেশে পদ্মা সেতু নানা কারণে অনন্য। এই বাংলাদেশে আর বুকভাঙা ট্র্যাজেডির উদ্গিরণ হবে না; বরং কালের আপেক্ষিকতা পরিষ্কার করে দিচ্ছে ক্ষুদ্র চাহিদা, মুহূর্তের পাওয়া, কয়েক মুহূর্তের দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকবে না বাঙালি। অনেক বাধা পেরিয়ে যারা পদ্মার বুকে সেতু তৈরি করতে পারে, তারা অনেক কিছুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেদের সাফল্যের মহাকাব্য লিখতে পারে। তা সমকালীন জীবন নয়, মহাকালের কথা বলবে। পদ্মা সেতুর ইট-বালু-সিমেন্ট-রড়ের পরতে পরতে ওই জীবনের বুনন। পদ্মা বহুমুখী সেতু নয়, বহুমাত্রিকও বটে। নিজেদের টাকায় পদ্মার বুকে সেতু! অবাস্তব! অসম্ভব! অর্থনীতিশাস্ত্রের বড় প-িতরা বারবার কথাটি বলেছেন! সবকিছু শাস্ত্র মেনে চলে না। এর প্রমাণও এই সেতু। মানুষের মনে অবচেতনের অনায়াস বিচরণ, কোথাও চেতনার ইতি, কোথায় বা অবচেতনের অভিক্ষেপ।

আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা বাদ দিন, বড় প-িতরা ঠিক পরিষ্কার করে বলতে পারেন না। তবে জীবনের সঙ্গে বাস্তবের, চিন্তার সঙ্গে অবচেতনের এ বুননকে অন্য মাত্রা দিলেন যিনি- তার নিজের ভাষায় ‘তিনি খুব সাধারণ, কম লেখাপড়া জানা লোক, সাধারণ এক বাঙালি নারী।’ কিন্তু অর্ধশতাব্দীর বাংলাদেশে তিনিই আত্মবিশ্বাসের এক মূর্তপ্রতীক, রাজনীতি আর অর্থনীতির অচলায়তন ভাঙা এক সফল নারী। তার জন্ম হয়েছিল পদ্মার ওপারে। তিনিই প্রথম ওই পদ্মা পেরিয়ে গেলেন গাড়ি নিয়ে, লিখে গেলেন পদ্মা নিয়ে নতুন এক উপন্যাস! রাজনীতি, রীতি- সবকিছু নিয়ে তার হাতে জন্ম নিল এক ‘আধুনিক উপন্যাস’- যার নাম ‘আত্মবিশ্বাস’। অবশ্য তার নিজের জীবনই এক ভয়ঙ্কর সুন্দর উপন্যাস! সভ্যতা বুটে দলে তাকে এতিম করা হয়েছিল। পচাত্তরের রক্তপাত তাকে অর্ধযুগ শরণার্থী বানিয়ে রেখেছিল! এর পর জীবনের কাছ থেকে যে শিক্ষা তিনি নিলেন, তা পরিণত মনস্ক ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত। তার জীবন ঘেরা সাহিত্য কে কীভাবে দেখবেন কিংবা কীভাবে তার ওই জীবন উপন্যাসকে ব্যাখ্যা করবেন, তা জানি না। তবে তার চলমান জীবনে একের পর এক যুগান্তকারী বদল ঘটেছে এই বাংলা। পদ্মা সেতু তারই একটি। তা নাড়িয়ে দিল বেশকিছু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা পদ্মাপাড়ের মানুষের জনজীবন। নদী ভাঙন, ঝড়-ঝাপটার সঙ্গে লড়াই ছিল ওইসব মানুষের জীবনের দৈনন্দিন ছন্দ। ওই ছন্দে আগামীতে লাগবে আধুনিক শিল্পের ছোঁয়া।

৫০ বছরের বাংলাদেশ দেখেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক হিংসা উন্নয়নের কত বড় প্রতিবন্ধক। আর্থিক তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক হিংসা লগ্নির পথে অন্তরায় এবং তা সামাজিক ও আর্থিক পরিকাঠামো পঙ্গু করে দেয়। এর পরও পদ্মা সেতু হয়েছে। এই সেতু হোক রাজনীতির মাঠেও এক বন্ধনের সেতু। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- ‘আমার কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই। এই উদার কণ্ঠস্বরকে স্বাগত জানিয়ে আমরা বলতে চাই- রাজনৈতিক পরিসরে অহিংসা উন্নয়নে সাধারণ মানুষকে বড় অংশীজন মনে করে দেশ এগিয়ে নিতে রাজনীতিবিদরা কাজ করলে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করেই দাঁড়াবে। উন্নয়নশীল দেশ নয়, উন্নত দেশের স্বীকৃতিও পাবে একদিন। তবে ওই উন্নয়ন হতে হবে সবার জন্য। পদ্মা সেতু আমাদের সবার, উন্নয়নও হতে হবে সবার।

পদ্মা সেতু নিয়ে রাজনীতি ও অর্থনীতির অনেক খেলা হয়েছে। কিন্তু ওই খেলায় জয়ী এ দেশের মানুষ। তাদের ওই জয়ের আনন্দ আর উচ্ছ্বাস দেখে মনে পড়ে ভূপেন হাজারিকার ওই গান- ‘এই পৃথিবী এক ক্রীড়াঙ্গন, ক্রীড়া হলো শান্তির প্রাঙ্গণ।’ কিন্তু পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক অশান্তির আগুনে যারা পোড়াতে চেয়েছিলেন দেশ আর দেশের মানুষকে, তাদের বিবেকবোধের জাগরণ হোক।

 

অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

advertisement