advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কাঁদো বাঙালি কাঁদো

বিভাস গুহ
৬ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২২ ০১:১৮ এএম
advertisement

আগস্ট মাস। বাঙালি জাতির জন্য শোকের মাস, বেদনার মাস। ১৯৭৫ সালের এই মাসের ১৫ আগস্ট বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, নির্যাতিত-নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্নচারী এক মহান মানুষ- যার সমুদ্রসম বিশাল অন্তরে মানুষের জন্য শুধুই ছিল ভালোবাসা, পাহাড়ের মতো অটল সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দৃঢ়তা, ঝরনার মতো গতিশীল যার কর্মধারা; প্রকৃতির মতো উদার এবং শান্তমনের এক অসাধারণ মানুষ, স্বাধীনতার মহানায়ক ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মম, নৃশংসভাবে রাতের আঁধারে হত্যা করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্রে এ দেশীয় উচ্চাভিলাষী বিপথগামী কতিপয় সেনাসদস্য। যে মহান নেতাকে পাকিস্তানিরা হত্যা করার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি, সেই বঙ্গবন্ধুকে নিজের দেশের মানুষের হাতে সপরিবারে প্রাণ দিতে হলো। বাঙালি জাতি হয়ে স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ পূরণের এটিই কি চরম মূল্য! এটিই কি বাঙালি জাতির কৃতজ্ঞতার নমুনা? এটিই কি বাঙালির হাজার বছরের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির সাধ এনে দেওয়ার পুরস্কার! ধিক্কার জানাই ১৫ আগস্ট রাতে যারা মানুষ হয়েও পশুর বেশ ধারণ করে হত্যা করেছিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে।

advertisement

ধিক্কার জানিয়েছিল গোটা বিশ্ব বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কারণে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান ১০ বছরের শিশু রাসেলকে পর্যন্ত নরঘাতকরা সেদিন রেহাই দেয়নি। একজন মানুষ কতটুকু নির্মম আর নিষ্ঠুর হলে একজন শিশুর বুকে সামনাসামনি গুলি চালাতে পারে, তা আমার ভাবনার বাইরে! যে কোনো শিশুর শরীরে সামান্যতম আঘাত করতে পর্যন্ত যেখানে আমাদের হাত কাঁপে, বকা দিলেও অনুশোচনা এসে ঘিরে ধরে নিজেদের হৃদয় ও মনকে- সেখানে কোমল শিশুকে রাইফেলের গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়া! আহ, কী যন্ত্রণা! কী নৃশংসতা, কী নির্মমতা, কী বর্বরতা, কী পাশবিকতা! না জানি রাসেল কতটা যন্ত্রণায় ছটফট করেছিল ওই মুহূর্তে! রাসেলের প্রিয় খেলনার জিনিসগুলো, প্রিয় সাইকেল সেদিনের ওই নারকীয় পরিবেশে যেমন ছিল- হয়তো তেমনই ছিল। ঘাতকদের কাছে মিনতি করেছিল মায়ের কাছে যাওযার জন্য। বিনিময়ে ঘাতকরা বুলেটের আঘাতে মায়ের নিথর পড়ে থাকা শরীরটা দেখিয়েছিল। প্রিয় হাসু আপার কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য মিনতি করেছিল। তার কাছে রাসেল নিরাপদ থাকত। নির্ভরতার শ্রেষ্ঠ আশ্রয় মনে করত তাকে। কিন্তু ঘাতকদের নির্মম বাক্যবাণ যেন আরও নিষ্ঠুর হয়ে আঘাত করেছিল রাসেলকে।

যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে আন্তরিক প্রচেষ্টায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন, প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে সোনার বাংলা গড়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করেছিলেন; ওই মুহূর্তে দুঃস্বপ্নের কালো আঁধারে ঢেকে দিল বাংলার আকাশ, দুর্গন্ধে বিষিয়ে তুলল বাংলার বাতাস, কান্নার জলে সিক্ত করে দিল বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, শোকে বিহ্বল করে দিল বিশ্ববাসীর অন্তরকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে, সৃষ্টি করল ইতিহাসের কালো অধ্যায়, কলঙ্কিত করল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গর্বের ইতিহাসকে। শুধু বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যা করে থেমে থাকেনি ওরা, হত্যা করার পর গোটা বাঙালি জাতির কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিয়েছিল। প্রতিবাদের ভাষা নিয়েছিল কেড়ে। যারা প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন, তাদেরও শেষ করে দিয়েছে। হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসহ বিভিন্নভাবে ওই সময় পুরস্কৃত করেছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। এ ছাড়া সেদিনের হত্যাকা-ের যাতে বিচার না হয়, এ জন্য ‘ইমডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলে ‘ইমডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। বাঙালি জাতির মনে তখন কিছুটা হলেও শান্তির সুবাতাস বইতে থাকে। কিন্তু মাঝখানে আবার ক্ষমতার রদবদল হলে বিচার কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ে। অবশেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচার রায়ের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালির ললাটে পরিয়ে দেওয়া কলঙ্কতিলক থেকে মুক্তি পায়। সেদিন রাতে ঘাতকদের হাতে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের প্রতি জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা।

বিভাস গুহ : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

advertisement