advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরলেও রাত কাটে নিদ্রাহীন

মো. দেলওয়ার হোসেন পাপ্পু ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট)
৬ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২২ ১২:১২ পিএম
advertisement

ঘরের চালা আছে, নেই মাটির দেয়াল। ভয়াবহ বন্যায় ধসে গেছে মাটির এই দেয়াল। বেড়াহীন ঘরেই সন্তানদের নিয়ে বসবাস ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ছত্রিশ গ্রামের সিতাই বেগমের। খোলা ঘরে সন্তানদের নিয়ে রাত কাটে নিদ্রাহীন। পানি কমলেও রাতের বেলা খোলা ঘরে বসবাস করলেও সাপ-বিচ্চুর ভয়ে ঘুম আসে না। ছেলেদের আয়ে সংসার চলে না যথারীতি, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সেখানে ঘর মেরামত যেন তাদের জন্য কল্পনাপ্রসূত। বন্যাপরবর্তী এলাকাগুলো নৌকাযোগে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ঘরে ফেরা দুর্গতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কাহিনি।

advertisement

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানি নামলেও সিতাই বেগমের মতো বিপর্যস্ত অনেক পরিবার। বন্যার পানি নেমে গেলে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরা উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের জীবন কাটছে দুুর্বিষহ কষ্টে।

গতকাল ছত্রিশ গ্রামের ইন্তাজ আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় নিজের ঘর এখন বসবাসের অযোগ্য। মেরামতে প্রয়োজন অনেক টাকা। তাই স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে আছি।

মাছ ধরে বিক্রি করে কোনো মতে জীবিকা নির্বাহ করেন উপজেলার বাঘমারা গ্রামের মিন্টু মিয়া। বন্যায় বাড়িঘরে পানি উঠলে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। মা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানসহ একই ঘরে বসবাস করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পানি থাকায় ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও ঘর মেরামত করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। পার্শ্ববর্তী পিঠাইটিকর গ্রামের তইরা বেগম ও আসারা বেগম জানান, তাদের ভাঙা ঘরে খুব কষ্টে রাত কাটাতে হয়। চাল ও বেড়ার বেহাল অবস্থা তাদের।

দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় দুস্থ মানুষরা ঘরে ফিরলেও উৎকণ্ঠায় কাটছে রাত-দিন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর নিদ্রাহীন রাত কাটে ভাঙা ঘরে। তাদের এই দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই। আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত খাবার পেলেও ঘরে ফিরে আহার যোগানের দুশ্চিতায় ভারি তাদের মন।

এ অবস্থায় ভাঙা ঘরে উনুন জ্বলে না, তখন রাতে ভয় ধরায় বৃষ্টি। সমাজের উঁচু তলার মানুষগুলোর কাছে বৃষ্টি মানে প্রেম বা কবিতা ভাব জাগানো কিংবা বৃষ্টিতে ভেজা উপভোগ্য হলেও বন্যায় বসতি হারানো মানুষগুলোর কাছে চরম ভয়ের কারণ।

দুর্গতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভয়াবহ বন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার অনেক এলাকা প্লাবিত হয়। দীর্ঘ এক মাস ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটে ছিল বন্যার পানিতে বন্দি। কুশিয়ারা নদীর পানি কমলেও রেখে গেছে দুর্ভোগ। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষজন নীড়ে ফিরলেও বাড়িঘর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াতে ভাঙা ঘরেই তাদের অনেকের রাত কাটে নিদ্রাহীন। সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার ছত্রিশ, পিঠাইটিকর, বাঘমারা, ঘিলাছড়ার পূর্ব যুদিষ্টিপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। মানুষজন বাড়িঘরে ফিরে ফের জীবন বেঁচে থাকার এক অসম লড়াই করছেন। একেবারেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। ঘিলাছড়া ইউনিয়নের পূর্ব যুধিষ্ঠির গ্রামের আকামুল জানান, বন্যায় ঘর ভেঙে পড়ে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে এখন স্ত্রী সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।

একই অবস্থা সাহেলা বেগমের। বন্যায় ঘর বিধ্বস্ত হওয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন ভাইয়ের বাড়িতে। অর্থাভাবে জীর্ণ কুটিরটুকুও মেরামত করতে পারছেন না তিনি। মাটির ঘরের চাল নেই, বেড়া নেই। তাদের দুর্ভোগ দেখতে আসা লোকজন কেবল সান্ত¦না দিয়েই চলে যান।

এবারের দীর্ঘস্থায়ী ভয়াবহ বন্যায় উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের অন্তত পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সান্ত¦না বলতে কেবল ত্রাণসামগ্রী পেয়েছেন তারা। তবে সরকার থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর মেরামতে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হলেও সেই টাকা অনেকের ভাগ্যে জুটেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইউপি সদস্যদের নিকটে কিংবা তার অধীনস্থ মানুষদের নাম গেছে তালিকায়। অভিযোগ উঠেছে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত হয়েছেন ওই টাকা থেকে।

এ ব্যাপারে ফেঞ্চুগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি রিয়াজ উদ্দীন ইসকা জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সবাইকে এগিয়ে আসা জরুরি। খাদ্যসামগ্রীর চেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামত করে দেওয়া।

এ বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বাধন কান্তি সরকার জানান, এবারের বন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৫৩। উপজেলার ৫ ইউনিয়নের ২২৫ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা প্রতিটি ইউনিয়নের ৪৫ পরিবারের মাঝে ১০ হাজার করে বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বরাদ্দ পাওয়া ৫০ পরিবারের জন্য ৫০ বান ঢেউটিনের সঙ্গে প্রত্যেককে ৩ হাজার টাকা করে বিতরণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ফেঞ্চগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সুদর্শন সরকার জানান, এবারে বন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় কাঁচা-পাকা প্রায় ৮২ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মেরামত করতে প্রয়োজন প্রায় ৫৭ কোটি টাকা।

advertisement