advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সংগ্রাম সংকটে বঙ্গমাতা

ফরিদুন্নাহার লাইলী
৮ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৮ আগস্ট ২০২২ ০২:৪৬ এএম
advertisement

প্রবল স্মৃতিশক্তির অধিকারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে ‘জীবন্ত ডায়েরির’ সঙ্গে তুলনা করতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রিয়তমা সহধর্মিণীকে ডাকতেন রেণু নামে। এই মহীয়সী নারী শুধু বঙ্গবন্ধুর অফুরান প্রেরণার উৎস ও নির্ভীক সহযাত্রীই ছিলেন না, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির প্রতিটি মুক্তিসংগ্রাম ও সংকটে রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। ৬ দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনেও তিনি নীরবে-নিভৃতে শক্তি ও সাহস জুুগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি দুর্বিপাকে পরিস্থিতি সামলে গেছেন সাহসের সঙ্গে। এভাবে রেণু থেকে হয়ে উঠেন বঙ্গমাতা।

advertisement 3

তিনি একদিকে যেমন সাধারণ একজন বাঙালি নারীর মতো স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, তেমনি বঙ্গবন্ধু যখন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে তখন তার অবর্তমানে মামলা পরিচালনা, দলকে সংগঠিত, আন্দোলন পরিচালনাসহ প্রতিটি কাজে নেপথ্যে থেকে সক্রিয় সহযোগিতা দিয়েছেন। জীবনের বড় একটি অংশ জেলে কাটাতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। অস্থির এ সময়গুলোতে বসে থাকেননি কিংবা ভেঙে পড়েননি। জেলখানায় দেখা করে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের ঘটনা বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে সেই নির্দেশ জানাতেন। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার চোখ বাঁচিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন। রাজনীতির মাঠে না থেকেও এভাবে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতেন নিভৃতে। কারাগারে সাক্ষাৎ করে বঙ্গবন্ধুকে মনোবল দৃঢ় রাখার সাহস দিতেন। আবার দলীয় কর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন। দলীয় কর্মকা- পরিচালনার জন্য সংসারের খরচের সঞ্চয় থেকে টাকা কর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছেন।

advertisement 4

১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া ফজিলাতুন নেছা রেণু বেঁচে থাকলে আজ ৯৩ বছরে পদার্পণ করতেন। এই আগস্টেই তার জন্ম ও মৃত্যু। বঙ্গবন্ধুর জীবনের সুখ-দুঃখের সাথি হয়েই শুধু নয়, মৃত্যুতেও সাথি ছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলেন। যখন ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে, তিনি বাঁচার আকুতি জানাননি। তিনি বলেছেন, ‘ওনাকে যখন মেরে ফেলেছ, আমাকেও মেরে ফেলো।’ এভাবে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে নিজের জীবনটা বিসর্জন দিয়ে গেছেন। তবে ফজিলাতুন নেছা বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন তার কর্মে-আদর্শে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনে বঙ্গবন্ধুর প্রধান উদ্দীপক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমানের জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এ মহীয়সী নারীর। তিনি সারাটা জীবন বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে ছিলেন। সংসারের সকল দায়িত্ব তিনি একাই সামলে নিয়েছেন। শেখ মুজিব নিশ্চিন্তে মন দিয়েছেন দেশ গড়ার কাজে রাজনীতি ও জনসেবায়। এই মহীয়সী নারী ছিলেন বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাতির পিতার একজন যোগ্য বিশ্বস্ত সহচর। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের সহযাত্রী ছিলেন ফজিলাতুন নেছা। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত মা-বোনদের পাশে দাঁড়ান, সান্ত¡না দেন। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন। মানবকল্যাণে তার ছিল অপরিসীম অবদান। তিনি সংগঠনের নেতাকর্মী ও গরিব আত্মীয়স্বজনের রোগশোকে চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক সংকটে মুক্তহস্তে দান করতেন। এ ছাড়া কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে আর্থিক সাহায্য, অনাথ, এতিম ও গরিব ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সব সময়ই। এ ছাড়া স্বাধীন দেশের নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করেছেন। নারীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

তিনি আমৃত্যু স্বামীর পাশে থেকে একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে দেশ ও জাতি গঠনে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশ ও জাতির জন্য তার অপরিসীম ত্যাগ, সহযোগিতা ও বিচক্ষণতার কারণে জাতি তাকে যথার্থই ‘বঙ্গমাতা’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। বঙ্গমাতা যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

বঙ্গমাতার আরেকটি দিক উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন নিরহঙ্কার ও পরোপকারী। পার্থিব বিত্তবৈভব বা ক্ষমতার জৌলুস কখনো তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বেগম মুজিবের সরল জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসেনি। রাষ্ট্রনায়কের স্ত্রী হওয়ার পরও কোনো অহংকার তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। বঙ্গমাতার এই গুণাবলিগুলো পথচলার ক্ষেত্রে আমাদের আদর্শ।

তাই বলতে হয়, ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়কের সহধর্মিণীই নন, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম এক নেপথ্য অনুপ্রেরণাদাত্রী। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি বঙ্গবন্ধুকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যেদিন ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু সেদিন একাকিত্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে তার অনুপ্রেরণাদায়ী বলেছিলেন ‘তুমি ফিরে এসেছ সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ। আমি উল্লসিত কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত ধূসর প্রান্তরে, ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রাম, ক্ষুধার্ত শিশু, বিবস্ত্র নারী আর হতাশাগ্রস্ত পুরুষ এবং সন্তানহারা জনক-জননী তোমার প্রতীক্ষায়। এভাবে বঙ্গবন্ধুকে আজীবন উৎসাহ, সাহস জোগাতেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব।

ফরিদুন্নাহার লাইলী : কৃষি ও সমবায় সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

advertisement