advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধর্ম
আশুরার তাৎপর্য ও শিক্ষা

মাওলানা এম এম আহমদ
৯ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৯ আগস্ট ২০২২ ০৯:১৯ এএম
advertisement

আজ ১০ মহরম। মুসলমানদের কাছে অতিসম্মানিত মহরম মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। মাসটি ইসলামের ইতিহাসে বহু ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে প্রসিদ্ধ। মহরম মাসের ১০ তারিখের দিনটিকে আশুরা বলা হয়। আশুরা, ‘আশিরুন’-এর বহুবচন। এর অর্থ- দশম তারিখের সমন্বয়।

বিশ্বনবীর (সা) প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা) অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন। মহানবী (সা) শান্তির যে বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন তা পদদলিত হয়েছে হজরত ইমাম হোসাইনের (রা) শাহাদাতের ঘটনার মাধ্যমে। হজরত ইমাম হোসাইনের সৈন্যবাহিনীর ওপর যখন শত্রু নিয়ন্ত্রণ পায় তখন তিনি ঘোড়াকে সমুদ্রমুখী করে অগ্রসর হওয়ার জন্য ইচ্ছা করেন, তার পরও তাকে বাধা দেওয়া হয় আর তার প্রতি তীর ছুড়ে এবং সেই তীর হজরত ইমাম হোসাইনের (রা) চিবুকের নিচে লাগে।

advertisement 3

ইতিহাস বর্ণনাকারী বলেন, আমি শাহাদাতের আগে তাকে এ কথাই বলতে শুনেছি, আল্লাহর কসম, আমার পর খোদার এমন কোনো বান্দাকে তোমরা হত্যা করবে না, যার হত্যার কারণে আল্লাহ তোমাদের প্রতি আরও বেশি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন। আমি আশা করি আল্লাহতায়ালা তোমাদের লাঞ্ছিত করবেন আর আমাকে সম্মানিত করবেন। এর পর আমার হত্যার প্রতিশোধ এমনভাবে নেবেন, যা তোমরা ভাবতেও পারো না। খোদার কসম, আমাকে যদি তোমরা হত্যা করো তা হলে আল্লাহতায়ালা তোমাদের মাঝে যুদ্ধ সৃষ্টি করবেন এবং তোমাদের রক্ত ঝরবে। যতক্ষণ পর্যন্ত বেদনাদায়ক শাস্তিকে আল্লাহ বহুগুণে বৃদ্ধি না করেন তিনি বিরত হবেন না।

advertisement 4

ইমাম হোসাইনকে (রা) শুধু শহীদই করেনি বরং কুফাবাসীরা তার পবিত্র লাশের সঙ্গেও জঘন্য আচরণ করেছে। আমর বিন সাদ আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা দেয়, কে কে হজরত ইমাম হোসাইনের মৃত দেহের ওপর ঘোড়া দৌড়ানোর জন্য প্রস্তুত। এ কথা শুনে দশজন ঘোড়সওয়ার বের হয় যারা নিজেদের ঘোড়া নিয়ে তার পবিত্র দেহের ওপর ঘোড়া দৌড়ায় এবং পিষ্ট করে আর তার বক্ষ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। হজরত ইমাম হোসাইনের (রা) পবিত্র দেহে ৪৫টি তীরের আঘাত বিদ্ধ হয়। তার মরদেহ পরে কুফার গভর্নরের কাছে পাঠানো হয়, সে তার শিরচ্ছেদ করে এজিদের কাছে প্রেরণ করে। (তারিখুত তিবরানি, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ: ২৪৩-২৫০)

একটু ভেবে দেখুন, মহানবীর (সা) প্রিয় দৌহিত্রের সঙ্গে এই পাষ-রা কতই না নির্দয় ব্যবহার করেছে। কোনো কলেমা পাঠক যে সেই রাসুলের সঙ্গে সম্পর্কের দাবি করে, যেই রাসুল মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার তাকিদপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন তার মান্যকারীরা কখনো এমন কাজ করতে পারে না। এমন কাজের মাধ্যমে এমন লোকদের অভ্যন্তরে শুধু নোংরামি আর নোংরামিই প্রকাশ পায়। এরা মূলত দুনিয়ার কীট ছিল, এরা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাধুতা-ভদ্রতার সব সীমা অতিক্রম করতে পারে এবং করেছে। ধর্মের সঙ্গে তাদের দূরতম সম্পর্ক নেই। এদের উদ্দেশ্যটা হজরত ইমাম হোসাইন (রা) উপলব্ধি করতে পেরেছেন, যার ফলে তিনি এজিদের বয়াত করতে অস্বীকার করেছিলেন।

হজরত ইমাম হোসাইন (রা) এজিদের প্রতিনিধিদের এ কথাও বলেছিলেন, আমি যুদ্ধ চাই না, আমাকে যেতে দাও, আমি গিয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে চাই বা কোনো সীমান্তে আমাকে পাঠিয়ে দাও যেন ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে করতে আমি শাহাদাতবরণ করতে পারি। তিনি এটিও বলেছিলেন, আমাকে এজিদের কাছে নিয়ে যাও যাতে আমি তাকে বোঝাতে পারি, আসল ব্যাপার কী। কিন্তু তার প্রতিনিধিরা কোনো কথা শোনেনি। অবশেষে যুদ্ধ যখন চাপানো হয় তখন বীরপুরুষের মতো মোকাবিলা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। এই স্বল্পসংখ্যক মুসলমান যাদের সংখ্যা ৭০-৭২ হবে তাদের মোকাবিলায় ছিল এক বিশাল সৈন্যবাহিনী। এদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। একে একে তারা সবাই শাহাদাতবরণ করেন।

আল্লাহতায়ালার প্রতিশোধ নেওয়ার নিজস্ব রীতি আছে, যেভাবে হজরত ইমাম হোসাইন (রা) নিজেই বলেছিলেন, আল্লাহতায়ালা আমার হত্যার প্রতিশোধ নেবেন। আমরা দেখতে পাই আল্লাহতায়ালা প্রতিশোধ নিয়েছেনও। এজিদ বাহ্যত সাময়িকভাবে সফলতা লাভ করেছে। প্রশ্ন হলো এজিদের নেকির কারণে কী আজকে কেউ তাকে স্মরণ করে? হজরত ইমাম হোসাইনের (রা) জীবনের একটি উদ্দেশ্য ছিল। তিনি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের লোভ রাখতেন না, তিনি সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি ন্যায়ের জন্য দণ্ডায়মান হয়েছিলেন।

হজরত ইমাম হোসাইনের ত্যাগ, কোরবানি আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রেখে গেছে। নিজের জীবন বাজি রেখে পৃথিবীতে সত্যের প্রসার করেছেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সত্য প্রচারের যে আদর্শ রেখে গেছেন তা সব সময় আমাদের আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে।

 

মাওলানা এম এম আহমদ : ইসলামি গবেষক ও কলাম লেখক

advertisement