advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

তরুণদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য দায়ী কে

রায়হান আহমেদ
১১ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২২ ০১:১৬ এএম
advertisement

একুশ শতকের বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, তা হলো তরুণদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার। দিন দিন এটা মহামারীর মতো বেড়েই চলেছে। একটা দেশ ও জাতির শক্তিশালী সম্পদ হচ্ছে যুবসমাজ। আর তাদের এই অবক্ষয় একদিনে তৈরি হয়নি। এই নৈতিক অবক্ষয়ের মূল কারণ হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকের বিস্তার, আকাশ সং¯ৃ‹তির বিষাক্ত ছোবল, বেকারত্ব, তাদের যথোপযুক্ত মূল্যায়ন না করা। আমরা সবাই জানি, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। অর্থাৎ যুবসমাজই পারে শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে দেশকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যুবসমাজ এখন বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতি হতাশায় নিমজ্জিত। যুবসমাজের অবক্ষয় জাতির বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। গোটা সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। আর এই সমস্যার প্রতিকার না হলে দেশ ও জাতি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে। একটি সমাজ ও একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পদ হলো তরুণ সমাজ। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি-সমৃদ্ধি নির্ভর করে তরুণ সমাজের ওপর। যে কোনো জাতির প্রাণশক্তি তাদের যুবসমাজ। যুবসমাজই জাতির আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক। যুবসমাজ যে কোনো দেশ ও জাতির সোনালি স্বপ্ন। আজকের যুবকরাই পরিচালনা করবে আগামীর সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতিকে। যুবকদের প্রেমময় রূপ ও শক্তির কারণে দরিদ্র, নিঃসহায় প্রবঞ্চিত ও নিগৃহীত জনতা লাভ করবে নতুন জীবন, প্রদীপ্ত হবে নব-উদ্দীপনায়। কিন্তু সম্প্রতি সেই যুবসমাজের প্রতি তাকালে জাতিকে অবাক হতে হয়। কারণ দেশ ও জাতির কর্ণধার সেই যুবসমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের অনেকেরই নৈতিক কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ নেই। এই যুবকদের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত, কেউ অসামাজিক, কেউ চাঁদাবাজি, কেউ অস্ত্রবাজি, কেউ চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, প্রভৃতি অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত। নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অবক্ষয়ে জর্জরিত আমাদের বর্তমান সমাজ। এটাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা।

advertisement 3

আমরা সামাজিক জীব। ব্যক্তির যেমন চাহিদা আছে, তেমনি সমাজেরও আছে। মানুষের কাছ থেকে সমাজ সব সময় সামাজিক আচরণ প্রত্যাশা করে। প্রত্যেক সমাজে তার সদস্যদের আচরণ পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি থাকে। নীতিহীন সমাজে উচ্ছৃঙ্খলতা, বিভ্রান্তি আর ও অনিশ্চয়তা বিরাজিত থাকে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে মানুষের মধ্যে আসছে নানা অনাকাক্সিক্ষত পরিবর্তন। সমাজ ও পরিবারে ধরছে ভাঙন। নষ্ট হচ্ছে পবিত্র সম্পর্কগুলো। ছিঁড়ে যাচ্ছে বিশ্বাসের সুতো। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান বেড়ে যাচ্ছে অনেক। আকাক্সক্ষা পরিপূরিত না হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঘটছে আত্মহত্যার মতো ঘটনা। মানুষের অন্যায্য অনৈতিক ব্যবহারে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে অন্য মানুষ। বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। দিন দিন মানুষের মানসিক বিকৃতি বাড়ছে। হতাশা বা অস্থিরতা বিরাজ করছে ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজজীবনে, বেঁচে থাকার প্রতিটি ধাপে। মায়া-মমতা, ¯েœহ-ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ পাশবিক হয়ে উঠছে। এমন কোনো অপরাধ নেই- যা সমাজে সংঘটিত হচ্ছে না।

advertisement 4

মূল কথা, মানুষ দিন দিন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছে। নিজেকে জাহির করা, নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ প্রিয়জনকে হত্যার মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হচ্ছে। নিজের জিদের লাগাম টানতে পারছে না মানুষ। এর প্রধান কারণ মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা। বিচ্ছিন্নতা থেকে তৈরি হয় হতাশা, বিষণœতা। তা ছাড়া মাদকাসক্তি সমাজের এই ন্যক্কারজনক হত্যাকা-গুলোর জন্ম দিচ্ছে। আধুনিক নগর সমাজের সার্বিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, শিশু-কিশোররা যে পরিবেশে লালিত-পালিত হচ্ছে- সেখানে তাদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই, ¯ু‹লগুলোয় মাঠের অপ্রতুলতা, বিনোদনের অভাব, ঘুরে বেড়ানোর জায়গার সীমাবদ্ধতা, সর্বোপরি অভিভাবকদের কাজের ব্যস্ততা। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা এবং বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আমরা তাদের ওই চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে ভিডিও গেমস, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক ওই জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেল শিশু-কিশোরদের দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। বর্তমানে কিশোর সমাজের এক বিশাল অংশ কাল্পনিক ভিডিও গেমসের অতিভক্তে পরিণত হয়েছে। ভিডিও গেমস গ্রুপ বানিয়ে মারামারি করছে। হার-জিত নিয়ে উত্তেজিত হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে সহনশীলতা একেবারেই কমে যাচ্ছে। অল্প বয়সেই তারা হিং¯্র হয়ে উঠছে। এতে সামাজিক অবক্ষয়, বিশৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ওই সমাজে মূল্যবোধ ধ্বংসের মুখে।

সমাজের সর্বস্তরে মূল্যবোধের এই অবক্ষয়ের শিকার আমাদের যুবসমাজ, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, শিক্ষা ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা যুবসমাজকে বিপথগামী করার ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী। অসুস্থ ছাত্র রাজনীতি নামধারী সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ ছাত্ররা। আর তাই এখনই নিতে হবে সময়োপযুক্ত পদক্ষেপ, শিক্ষাঙ্গনকে করতে হবে সুশিক্ষার কারখানা। সব ধরনের মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, উৎপাদন, বিক্রি নিষিদ্ধ করে কঠোরহস্তে দমন করতে হবে।

মানবসভ্যতায় যুবসমাজের রয়েছে মুখ্য ভূমিকা। তাই তাদের দিকে বাড়িয়ে দিতে হবে ¯েœহের হাত। তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিচালিত করতে হবে সঠিক পথে। বোঝাতে হবে যে, তাদের দিকে চেয়ে আছে গোটা দেশ ও জাতি। তাই শুধু সরকার নয়, এ সমাজকেও বাড়িয়ে দিতে হবে তাদের দিকে সহানুভূতির হাত। তবেই রক্ষা করা যাবে যুবসমাজ আর বাঁচবে দেশ এবং বয়ে আনবে সমাজের জন্য কল্যাণ।

রায়হান আহমেদ : গবেষক ও কলাম লেখক

advertisement