advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সংকট এবং সম্ভাবনায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শই পথ দেখাবে

ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার
১৩ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২২ ০৯:২৩ এএম
advertisement

বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির পিতা। পৃথিবীর অনেক জাতিরই জাতির পিতা আছে। তার মানে জাতির পিতা সেই জাতির পরিচয়ের সেরা কাণ্ডারি। বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী স্বাধীন দেশ। যেখানে ৩০ লাখ মানুষ তাদের বুকের রক্ত দিয়ে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য হলো, স্বাধীনতার যে মৌলিক চেতনা ছিল সেটি নানা সময়ে নানাভাবে সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় ১৯৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। যার ফলে ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু বা পরিবার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি তা সম্ভবত নতুন করে বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না। আমাদের মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধু আজকে নেই কিন্তু তার আদর্শ আমাদের কাছে রেখে গিয়েছেন। তিনি দেশ বিভাগের পর পরই ১৯৪৮-এ প্রথম ভাষার প্রশ্নে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে এই ভূখণ্ডের মানুষের যখন মতের পার্থক্য তৈরি হয়, তখন তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। অনেকে বলছেন, বঙ্গবন্ধু সেই সময়েই মনে করতেন যে, পশ্চিমাদের সঙ্গে আর সহাবস্থানে থাকা যাবে না। এটি বাংলাদেশের তৎকালীন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকেই মনে করতেন। কিন্তু তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি মানুষের মানসিকতাকে ধারণ করে। তাদের সংগঠিত শক্তি হিসেবে বৈপ্লবিক শক্তিতে রূপান্তর করার মত দৃঢ়তা, সাহস বা ধৈর্য বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কোনো নেতার মাঝে দেখা যায়নি।

বঙ্গবন্ধু সেটা পরে প্রমাণ করেছেন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-তে বঙ্গবন্ধুর উত্থাপিত ৬ দফা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন সব ইতিহাসের বাঁকে বাঁকেই উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী অবদান রাখতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। বলতে হবে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাঙালি জাতি অনেকটা কা-ারিবিহীন নৌকার মতো দিকশূন্য পথে চলার অবস্থায় পড়েছে। বঙ্গবন্ধুই একজন ব্যতিক্রমী নেতা যার নেতৃত্বে নিরস্ত্র বাঙালি সংগঠিত হয়েছে, চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ৭ মার্চে তার ভাষণই ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা। ওইদিনই তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। একাত্তরে বঙ্গবন্ধু যখন পাক শাসকের হাতে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন সেই সময় বন্দি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার যে আহ্বান, মুক্তির ডাক বাঙালির জীবনে কতটুকু বৈপ্লবিক জাগরণ তৈরি করেছিল সেটি আমরা দেখেছি। তার অনুপস্থিতিতে গোটা বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নামের ওপরে, জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করে ইস্পাত শপথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জীবন বাজি রেখে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। কিন্তু কথা হলো বঙ্গবন্ধুকে কারা কীভাবে হত্যা করল। এটি দুর্ভাগ্যজনক সত্য যে, স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হয়েছে এবং যারা সামনে থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারে এই হত্যাকা- সংঘটিত করেছিল তারা সবাই বাঙালি। তারা দেশি-বিদেশি অপশক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মানুষ, যিনি একেবারেই নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র শক্তিতে রূপান্তর করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মতো একটি নীলনকশা বাংলাদেশে তৈরি হলো কীভাবে, কারা তৈরি করেছে? আসলে যারা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি, যারা পাকিস্তানি চেতনায় বিশ্বাস করেছে তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। আজকে বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোট খাচ্ছে আবার উতরে যাচ্ছে। আমরা দেখতে পাই ’৭৫-এর পর বাংলাদেশ পেছনের দিকে চলতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিপরীত দিকে। কিন্তু ১৯৮১-তে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে হাঁটি হাঁটি পা-পা করে ঐক্যবদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তিনি যখন ১৯৯৬-এর নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেন, তখন তিনি আবার মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে সাজাতে শুরু করেন এবং মুক্তিপাগল বাঙালির হাতে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দেওয়ার সব কর্মকা- অতিযত্ন সহকারে পালন করেন। আজকে বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু পদ্মা সেতুর মতো একটি বিশাল বড় আর্থিক প্রকল্প বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে করার সাহস পেয়েছে। এটি আসলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বলেই সম্ভব হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের চেতনায় বাঙালি জাতি এখনো ঐক্যবদ্ধ আছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন সেই কারণেই সম্ভব হয়েছে। তাই আমাদের বলতে হবে, যখন বঙ্গবন্ধুর চেতনা বা আদর্শ বা প্রেরণা বাঙালি জাতির জীবন থেকে দুর্বল হয়ে যায়, ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যায় তখনই বাংলাদেশ পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

advertisement 3

আমরা ’৭৫-এর পর যেমন দেখেছি, তেমনি পরবর্তী সময়েও দেখেছি। আবার যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে দেশের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তখন বাংলাদেশ আবার তার সঠিক পথে দিশা খুঁজে পায়। এটি শুধু পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে সত্য তা নয়, দেশের সব কর্মকা-েই তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেক এগিয়ে গেছে। উড়াল সেতু তৈরি হয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো একটি অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক বড় মাপের প্রকল্প বাংলাদেশে করা সম্ভব হচ্ছে। এটি শুধু বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু দেশ রাশিয়া সফরের পর দুই দেশের রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের জন্যই সম্ভব হয়েছে। রাশিয়া এখানে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সহযোগিতা করছে। একইভাবে আমাদের বন্ধু দেশ ভারতসহ অন্যান্য বন্ধু দেশ মুক্তিযুদ্ধের ধারা বজায় রাখতে সাহায্য করছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ধারণ করে যখনই আমরা পথ চলেছি তখনই বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা সচল থেকেছে। কিন্তু যখনই আমরা বঙ্গবন্ধুর চেতনা থেকে সরে এসেছি তখনই বাংলাদেশ মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই বাংলাদেশের যে কোনো সংকটে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, চেতনা আমাদের পথ দেখিয়েছে। একইভাবে আমরা যখন সম্ভাবনার জায়গাতে কাজ করেছি তখনো আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে দৃঢ়ভাবে সাহসী ভূমিকা পালন করে দেশকে পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে অনেক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছি। তাই বাংলাদেশের মানুষের জন্য, দেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শসমূহ কল্যাণকর আদর্শ হিসেবে অতীতে বিবেচিত হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও বিবেচিত হবে। বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। সংকটেও বঙ্গবন্ধুর কাছে ফিরে যেতে হবে আবার যখন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে তখনো আমাদের বঙ্গবন্ধুর চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া চলবে না। বঙ্গবন্ধুর চেতনাই আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। সেই স্থানে যে স্বপ্ন আমাদের ৩০ লাখ শহীদ ’৭১-এ দেখিয়েছিলেন, যেই স্বপ্ন আজকে আমাদের ১৭ কোটি বাঙালি দেখছে সেটি বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্র সংবিধানে সংযোজন করেন। তিনি মনে করতেন এ দেশ জনগণের, এ দেশ দেশের সব মানুষের তাই তিনি গণতন্ত্র সংবিধানে সংযোজন করেন। তিনি জোটে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন সারাবিশ্বই একজোট। সব দেশ সমভাবে উন্নতি করবে, সব দেশই সবার পাশে দাঁড়াবে। তিনি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে ইতিবাচক ধারার বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। যা বাংলাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে উজ্জ্বল উদীয়মান নক্ষত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন এবং এ ব্যাপারে অনেক কর্মকা-ও হাতে নেন। তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে সম্মানের জায়গায় নিয়ে যান। জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যান।

advertisement 4

বঙ্গবন্ধু এমন একটি সত্তা যার উপস্থিতি এই ভূখণ্ডকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, যার অনুপস্থিতি দেশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলেছে। কিন্তু যখন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের হাল ধরেছেন তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, তার চেতনার দীপশিখা জ্বেলে দেশকে আলোকিত করেছেন। দেশকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা আমাদের সবাইকে ধারণ করতে হবে।

 

অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার : সাবেক উপ-উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

 

advertisement