advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সাগরে মিলছে না ইলিশ
ভালো নেই উপকূলের জেলেরা

ঋণের ভার প্রাকৃতিক দুর্যোগ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি

ইমরান হোসাইন,পাথরঘাটা (বরগুনা)
১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২২ ০১:০৪ এএম
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বরগুনার পাথরঘাটায় নোঙর করা ট্রলার- আমাদের সময়
advertisement

মাছের ওপর নির্ভর করেই চলে উপকূলীয় জেলেদের জীবন-জীবিকা। ইলিশের মৌসুম শুরুতে ২০ মে-২৩ জুলাই পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ৬৫ দিন সব মাছ ধরা বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ২৩ জুলাই মধ্যরাত থেকে ফের সাগরে মাছ ধরা শুরু হয়। শুরুতে দুদিন ইলিশ ধরা পড়লেও এর পর আর পর্যাপ্ত ইলিশসহ সমুদ্রের মাছ ধরা পড়ছে না দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকা পাথরঘাটায়। এর মধ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমুদ্রে যেতে পারছেন না জেলেরা। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে তাদের দুশ্চিন্তা।

গভীর সমুদ্রে ও স্থানীয় নদীতে ১০ থেকে ১২ দিন ধরে সাগরে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা। এর মধ্যে চড়ামূল্যে জ্বালানি তেল কিনে সাগরে নামার পর মাছ না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় ট্রলার মালিকরা সাগরে ট্রলার পাঠাচ্ছেন না। এ কারণে প্রায় তিনশ ট্রলার ঘাটে নোঙর করা আছে। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলেরা ও বিপণন পেশায় নিয়োজিত উপকূলের পাথরঘাটার প্রায় ৫০ হাজার পরিবার। মাছ ধরতে না পারায় অভাবের বেড়াজালে দিশাহারা এসব জেলেরা। এনজিও থেকে লোন নিয়ে দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেক জেলে।

advertisement

এদিকে গতকাল শনিবার দেশের বৃহত্তম সমুদ্রের মাছের পাইকারি বাজার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বিএফডিসি) গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে কয়েকটি ট্রলার ভিড়েছে, এসব ট্রলারে অল্প পরিমাণ মাছ ধরা পড়েছে। মাছ ধরা না পড়ায় এখনো প্রাণ ফেরেনি বন্দরটির। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন বন্দরের শ্রমিকরা। মাছ না থাকায় বন্দরে অলস সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। বন্দর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অন্তত ৩০০ ট্রলার ঘাটে নোঙর করে আছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও বৈরী আবহাওয়া থাকায় ট্রলারগুলো সাগরে যাচ্ছে না।

advertisement 4

পাথরঘাটায় জেলের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে নিবন্ধিত ১১ হাজার ৪১১ জন। নিবন্ধিত জেলেদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ভিজিএফের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ৫৬ কেজি করে চাল দেওয়া হলেও অনিবন্ধিত জেলেরা পায়নি কিছুই। এখন জ¦ালানি তেলের দম বেড়েছে। সাগরেও মাছ ধরা পড়ছে না। আয়ের পথ না থাকায় জেলেদের বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলার হাড়িটানা এলাকার জেলে ফোরকান, রফিক ও নুরুল ইসলাম বলেন, ট্রলার ও জাল মেরামত করে বসে রয়েছেন। এখন সাগরে ইলিশ নেই। অন্যান্য মাছও ধরা পড়ছে না। এমন অবস্থায় অতিরিক্ত টাকা খরচ করে সাগরে ট্রলার নামিয়ে লাভ নেই। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, সাগরে মাছ না থাকায় এখন আয়ের পথ বন্ধ, এখন বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি। এনজিওর লোন আছে দিতে না পারলে এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে।

পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. এনামুল হোসাইন বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে ইলিশ ধরা না পড়ায় পাথরঘাটা সমুদ্রের মাছের পাইকারি বাজারে তেমন ইলিশসহ মাছ আসছে না। মাছ না পাওয়ায় জেলেরা দাদনের টাকা শোধ করতে পারছেন না। বাজারে মাছ না আসায় শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। এখন আমাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, এখন সাগরে পর্যাপ্ত ইলিশ নেই। তেলের দাম বৃদ্ধি, ১০ থেকে ১২ দিনের প্রতিটি ট্রিপে একটি ট্রলারে প্রায় ৩ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। তেলের দাম বাড়ায় খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এত দাম দিয়ে তেল কিনে সাগরে ট্রলার পাঠিয়ে আশানুরূপ মাছ ধরা পড়ছে না, এতে অনেক টাকা লোকসান হচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বরগুনার প্রায় দেড় হাজার ট্রলার ঘাটে নোঙর করা আছে বলে জানান তিনি।

পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ুন্ত কুমার (অপু) আমাদের সময়কে বলেন, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ভিজিএফের উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১ হাজার ৪১১ জন জেলে খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। জেলেদের জীবনমান ও সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় ‘সাসটেইন্যাবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উপকরণ বিতরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্পদের উন্নয়ন টেকসই করার লক্ষ্যে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যস্থাপনা প্রকল্প’ মৎস্য অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের অধীনে গত অর্থবছরে পাথরঘাটায় ২৬৫ জন জেলেকে ও মাঝিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ৪৫টি পরিবারকে গরু দিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞার পর পাথরঘাটায় ইলিশ ধরা না পড়লেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইলিশ ধরা পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ইলিশ দলবদ্ধভাবে চলাচল করে। তবে বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী ও সমুদ্রে ইলিশের পরিমাণ বাড়বে। তখন নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়বে। কয়েকদিন অপেক্ষা করলেই মিলবে কাক্সিক্ষত ইলিশ।

 

 

 

advertisement