advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রক্তে ভেজা আজ ১৫ আগস্ট

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত
১৫ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২২ ১২:৩৫ এএম
advertisement

আজ জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির হৃদয়ভাঙা বেদনার দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তিনি তার সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বাঙালির মুক্তির জন্য, বাঙালির স্বাধিকারের জন্য। এ রাতে তাকেই জীবন দিতে হয়েছিল কিছু কাপুরুষের হাতে। শুধু তাকে নয়, সেদিন হত্যা করা হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্ব^রের বাসায় থাকা তার পরিবারের সবাইকে, এমনকি তার শিশুপুত্র রাসেলকেও। ওই রাতে সেনাবাহিনীর একটি দলছুট অংশ এই হামলা চালালেও এর পেছনে ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের এক গভীর ষড়যন্ত্র। ইতিহাস ক্রমেই তা স্পষ্ট করছে। জাতির অধিকার রয়েছে ওই ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয় জানার।

advertisement

স্বাধীনতার পর দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্ব^ী করার সংগ্রামের পাশাপাশি ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন সংগ্রামের ডাক দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কতটা সোচ্চার ছিলেন, তা আলোচনায় এসেছে সামান্যই। তার ভাষণগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণ বয়স থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। তিনি দুর্নীতিকে দেশের এক নম্ব^র সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

advertisement 4

মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন দেশে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কয়েক লাখ ভক্ত-অনুরাগীর সামনে দেওয়া ভাষণে স্বাধীনতার সার্থকতা ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ঘোষণা করেন। আবেগাপ্লুত জাতির পিতা বলেন, ‘আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম- ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেটভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়। ...যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই, যেখানে রাস্তা ভেঙে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দেও। আমি চাই জমিতে যাও, ধান বোনাও, কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজনও ঘুষ খাবেন না, ঘুষখোরদের আমি ক্ষমা করব না।’ মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের সংকট নিরসনে দুর্নীতিকে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন তিনি। তার মনে ছিল মানুষের কল্যাণ।

সদ্য স্বাধীন দেশটিতে তখন চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল শুধুই ধ্বংসস্তূপ, পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংসতার ছাপ। রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য। ছিল না দক্ষ প্রশাসন। এরই মধ্যে পাকিস্তান কারাগারের ফাঁসির মঞ্চ থেকে রক্ষা পেয়ে বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছিলেন বাংলাদেশে। শুরু করেছিলেন দেশ গঠনের নতুন সংগ্রাম। মাত্র সাড়ে তিন বছরে পাহাড়সম বাধা অতিক্রম করে দেশকে তিনি নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তার নান্দনিক নেতৃত্বের গুণে বাংলাদেশ ও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তি এবং উন্নয়নের সংগ্রামে ভরসার ছায়া হয়ে আছেন। সংগ্রামী এই রাজনৈতিক শিল্পীর ক্যানভাসে উদ্ভাসিত হয়ে আছে বাংলাদেশ নামক এক রঙিন মানচিত্র। এই শিল্পীর ক্যানভাসে লেপ্টে আছে মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, মুক্তিসংগ্রাম ও দরদি নেতৃত্বের অসামান্য সব প্রতিচ্ছবি। একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। দেশটিকে কী করে সমৃদ্ধ ও জনবান্ধব করা যায়, ওই অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামেও তিনি ছিলেন অবিচল। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল। ছিল খাদ্যাভাব, ছিল দারিদ্র্য, ছিল দুর্নীতি। কিন্তু তিনি পুরো সমাজ ও প্রশাসনের খোলনলচে বদলে দেওয়ার আমূল সংস্কারবাদী সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। নয়া ব্যবস্থায় খাদ্যোৎপাদন বাড়ছিল। তবে আমাদের বড়ই দুর্ভাগ্য যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে এ দেশেরই কতিপয় ক্ষমতালোভী কুসন্তান-পিশাচ বাঙালির মুক্তির এই মহানায়ককে নির্মমভাবে হত্যা করে। তারা ভেবেছিল, এই হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে চিরদিনের জন্য তাকে মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে। তিনি চিরজাগ্রত আমাদের গল্প, কবিতা ও শিল্পীর তুলির আঁচড়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে সংঘটিত নিষ্ঠুরতম হত্যাকা-ের পর সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়। নিষিদ্ধ করা হয় সভা-সমাবেশ। ভয়, আতঙ্ক, গুজব আর অপপ্রচারের ফলে দেশে তৈরি হয় এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাকে হত্যা করা হতে পারে- এটি ভাবতে পারেনি কেউ। ফলে হতবিহ্বল ও কিংবর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো রাজনৈতিক কোনো নেতৃত্ব ছিল না। এর পরও থামিয়ে রাখা যায়নি প্রতিবাদ বিক্ষোভ। নজিরবিহীন কড়াকড়ি আর সামরিক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই বিভিন্ন জায়গায় দুঃসাহসী মুজিবপ্রেমীরা নেমে আসেন রাস্তায়, বজ্রকণ্ঠে জানান প্রতিবাদ, প্রকাশ করেন ঘৃণা।

হায়েনারা রাতের অন্ধকারে এই হত্যাকা- ঘটায়। বাহ্যত দলছুট কতিপয় সেনা সদস্যকে কাজে লাগালেও পেছনে ছিল অনেক বড় নীলনকশা। ব্রিটিশ সাংবাদিক মাসকারেনহাসসহ অনেকেই তুলে ধরেছেন ওই ষড়যন্ত্রের অনেক অজানা কথা। তুলে ধরেছেন কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কবে, কখন ঘাতক রশীদ বৈঠক করেছিলেন- সেসব তথ্য। খন্দকার মোশতাক ও একটি প্রভাবশালী দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত কীভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছিলেন- অনেক কিছুই স্পষ্ট হয় পরবর্তী ঘটনামালা থেকে। রাষ্ট্রদূত বানিয়ে ঘাতকদের পুরস্কৃত করা, ইনডেমনিটির ঘোষণা দিয়ে খুনিদের বিচার রোধের অপচেষ্টা, স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করা, একাত্তরের ঘাতক আবদুল আলীমসহ রাজাকার-আলবদরদের মন্ত্রী করা, গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা- এমন অনেক ঘটনাই প্রমাণ করে পঁচাত্তরের ষড়যন্ত্রে কারা যুক্ত ছিল।

১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করলে প্রচলিত আইনে হত্যাকা-ের বিচার শুরু হয়। বিচারিক প্রক্রিয়াতেও উঠে আসে ষড়যন্ত্রের নানা দিক। বিচারের রায় অনুযায়ী কয়েক খুনির মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। আর কয়েক খুনি বিদেশে পালিয়ে আছে। তাদের ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার মাধ্যমে জাতিকে সম্পূর্ণরূপে কলঙ্কমুক্ত করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তার এক ঐতিহাসিক সম্মোহনী ভাষণে বলেছিলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারব কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ জাতির পিতার প্রাণের ওই বাংলার মাটিতেই তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন। যারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু আর তার পরিবারকে হত্যার মাধ্যমে নিজেদের হাত রঞ্জিত করেছে, তারা পুরো বাঙালি জাতিকে রক্তাক্ত করেছে। স্বাধীনতার অর্জনকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র এখনো অব্যাহত আছে। তাই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খোলা জরুরি। একইভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী এবং মদদদাতাদের’ চিহ্নিত করে বিচারের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি ‘কমিশন’ গঠন করার দাবিও এখন প্রাসঙ্গিক। আমরা চাই, দ্রুত ওই কমিশন গঠনের মাধ্যমে আইনসিদ্ধভাবে জাতির সামনে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক।

আজকের বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুকে শুধু পোস্টার, সাইনবোর্ড ও বক্তৃতা কথামালার মধ্যে সীমিত এবং সাজিয়ে রাখলে তার পরিপূর্ণ মূল্যায়ন হবে না। বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন ও আদর্শের নাম। এর সুবিধা পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতি থেকে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-দর্শন আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারিনি বলেই আজ রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতিতে ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটেছে। এটি আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। কথায় আছে, দেরি হলেও এখন দ্রুত শুরু করতে পারলে ভালো। নতুন প্রজন্ম বুঝবে পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকলে পুরো বিশ্ব হবে তাদের কর্মস্থল, অবারিত হবে তাদের চলার পথ।

জাতির পিতার কন্যা মাতৃসম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য বদ্ধপরিকর। তিনি নিরলস পরিশ্রম করছেন। তার হাতে বাংলাদেশ নিরাপদ। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আগের চেয়ে সুদৃঢ়। বাংলাদেশের সম্মান বিশ্বের বুকে গৌরবময় হয়েছে। আজ শোকের দিনে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : শিক্ষাবিদ ও সংসদ সদস্য

advertisement