advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মিয়ানমারকে সংযত হতে হবে

দয়াল কুমার বড়ুয়া
২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:৪৮ এএম
advertisement

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারের সংঘাতের প্রভাব নিজ এলাকার ওপর পড়ার পরও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সংযম দেখাচ্ছে। শনিবার ব্রিটিশ বিরোধীদলীয় নেতা ও লেবার পার্টিপ্রধান স্যার কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠককালে এ মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের দীর্ঘায়িত উপস্থিতি কীভাবে বাংলাদেশের ওপর বোঝা হয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে ব্রিটিশ নেতাকে অভিহিত করেন।

advertisement 3

প্রধানমন্ত্রী এমন এক সময়ে মিয়ানমারের সংঘাত সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যখন সে দেশ থেকে আসা গোলাগুলিতে বাংলাদেশের একজন নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।

advertisement 4

শনিবারও কক্সবাজারের উখিয়ার পার্শ্ববর্তী ঘুমধুম ইউনিয়নের ঘুমধুম-তুমব্রু সীমান্তে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। সারারাত ভয়ে ঘুমাতে পারেনি সীমান্ত এলাকার মানুষ। আতঙ্কগ্রস্ত অনেকেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। সীমান্ত এলাকার ৭০ পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি সামলাতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে কয়েকবার তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সুপ্রতিবেশীসুলভ নীতিতে বিশ্বাসী। বন্ধু পাল্টানো যায় কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। ছোট হোক, বড় হোক প্রতিবেশীর সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক রেখে ভালো থাকা যায় না। যে কারণে মিয়ানমারের ১২ লাখ মানুষ সে দেশের সেনা অভিযানে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও বাংলাদেশ সংযত আচরণ করছে। রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখলেও সহনশীলতা দেখিয়ে চলছে। বাংলাদেশ সীমান্তে গোলাগুলি সত্ত্বেও সংযম প্রদর্শন করছে। মিয়ানমারের সুবুদ্ধির উদয় না হলে এক সময় বাংলাদেশকেও অনাকাক্সিক্ষত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হবে। তা মিয়ানমারের জন্য কাম্য হবে কিনা সময় থাকতেই ভেবে দেখতে হবে।

২০১৬ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞ থেকে রেহাই পেতে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে এবং মূলত কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। এর ফলে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় জনজীবনে নেমে এসেছে এক দুর্বিষহ অবস্থা। রোহিঙ্গারা মাদক, অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

তাদের নিজেদের মধ্যেও হানাহানি, খুনোখুনির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারে রেখে অন্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নেরও চেষ্টা করছে কোনো কোনো শক্তি, যা হবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই জটিল হচ্ছে। দিন-তারিখ ঠিক হওয়ার পরও কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমার প্রকৃতপক্ষে কোনো কাজই করছে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও মিয়ানমারের ওপর জোরালো কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না।

ঠিক এ অবস্থায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির গোলাগুলি চলছে। পাহাড়-জঙ্গলে আরাকান আর্মির আস্তানা ধ্বংস করতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর জেট ফাইটার ও হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া হচ্ছে বোমা ও মর্টারশেল। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রাখাইনদের সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাতের মধ্যে গোলা এসে বাংলাদেশ সীমান্তেও পড়েছে। সংঘাতের মধ্যে গত ২৮ আগস্ট দুপুরে বান্দরবানের ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমার থেকে দুটি অবিস্ফোরিত মর্টারশেল এসে পড়ে। ৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধবিমান ও দুটি ফাইটিং হেলিকপ্টারের গোলা বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে এসে পড়ে। বেশ কয়েকবার মিয়ানমারের যুদ্ধবিমানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটে। সীমান্তের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

শুক্রবার রাত ৮টার দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু ও কোনাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পের ভেতর গোলা পড়ে বিস্ফোরিত হয়ে কয়েকজন হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের মর্টারশেল নিক্ষেপ ও হতাহতের ঘটনায় মিয়ানমারকে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনে জাতিসংঘে অভিযোগ করা হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না। শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারকে সবার আগে দেশের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। আমরা মনে করি, সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমনে একমাত্র ব্যবস্থা হতে পারে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে এবং নানা উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। সরকার এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

দয়াল কুমার বড়ুয়া : কলাম লেখক ও রাজনীতিবিদ

advertisement