advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অপচয় খেয়ে ফেলছে সাশ্রয়

এম এইচ রবিন
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৯:৫৪ এএম
advertisement

সরকারের ব্যয় কমাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার এবং কর্মচারীদের বিদেশ সফরসহ বিভিন্ন খাতে কৃচ্ছ্রসাধন করার জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তবে এসব কৃচ্ছ্র সাধনের চেয়েও খাদ্য, পানি ও জ্বালানির অপচয় রোধ করাই এখন অধিকতর জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের কিছু বিভাগ ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে- দেশে বছরে এক কোটি ৬ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়। গ্যাস অপচয় (সিস্টেম লস) হয় বছরে ৬৫ কোটি ঘনমিটার। আর শুধু ঢাকা শহরেই দিনে ৫০ কোটি লিটার পানির অপচয় হয়।

advertisement

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউনেপের তথ্যানুযায়ী দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয়, তার একটি বড় অংশ নষ্ট কিংবা অপচয় হয়। বাংলাদেশে বছরে খাদ্য অপচয় হয় এক কোটি ৬ লাখ টন। একজন বাংলাদেশি বছরে ৬৫ কেজি খাদ্য (উপাদিত কিংবা তৈরি) নষ্ট করেন। ইউনেপের ২০২১ সালে প্রকাশিত ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও বাংলাদেশে একটি গবেষণা করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে উচ্চ আয়ের পরিবারে খাদ্য বেশি অপচয় হয়। উচ্চ আয়ের পরিবারে এক মাসে মাথাপিছু ২৬ কেজি খাদ্য অপচয় হয়। সে তুলনায় মধ্য ও নিম্নআয়ের পরিবারে অপচয় কম হয়।

advertisement 4

এই গবেষণা দলের প্রধান ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান আমাদের সময়কে বলেন, দেশে কয়েকটি ধাপে খাদ্য অপচয় হয়। তবে ফসলের ক্ষেত থেকে খাদ্যসামগ্রী বাজারে এসে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী পর্যায়ে সবচেয়ে বড় অপচয়টি হয়। এর মধ্যে ফসল তোলার পর্যায়ে এক ধরনের অপচয় হয়, মজুদ বা সংরক্ষণ করা এবং বেপারির মাধ্যমে সেটি বাজারজাত করার সময় আরেকবার অপচয় হয়। এর পর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যখন বড় শহরে ফসল, সবজি, ফল, মাংস, ডিম বা দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আসে তখন আরেক দফায় অপচয় হয়।

এফএওর গবেষণা তথ্যানুযায়ী শস্যদানা মানে চাল, গম ও ডাল এসব উৎপাদন থেকে মানুষের খাবারের প্লেট পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই প্রায় ১৮ শতাংশ অপচয় হয়। ফল আর সবজির ক্ষেত্রে অপচয় হয় ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত।

এর কারণ হিসেবে অধ্যাপক হাসান বলেন, দেশের কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কম। ফলে মাঠ থেকে ফসল তোলা, প্রক্রিয়াকরণ এবং মজুদ, তার পর সেগুলো বাজারে পরিবহনের প্রতিটি পর্যায়েই অপচয় হয়। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের কৃষিতে প্রযুক্তির কম ব্যবহার, সংরক্ষণের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকা এবং বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবই খাদ্য অপচয়ের প্রধান কারণ। কৃচ্ছ্র সাধনের চেয়ে শুধু অপচয় বন্ধ করেই আমাদের চাহিদার অনেকাংশ মেটনো সম্ভব বলে মনে করেন তিন।

অধ্যাপক হাসান বলেন, ‘ফুড লস’ ঠেকাতে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে পুরো চক্রটির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব। এজন্য আগেভাগে পরিকল্পনা করে কেনাকাটা, রান্না, এবং পরিবেশনের কাজ করলে অপচয় কমে আসবে।

যেভাবে খাদ্য অপচয় রোধ করা যাবে : বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চাহিদার তুলনায় বেশি কেনাকাটা না করার চেষ্টা করতে হবে। আপনার কী প্রয়োজন তার একটি তালিকা করে বাজারে যান, তা হলে বাড়তি অর্থব্যয় ও অপচয় কম হবে। খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে অপচয় কমে আসবে। অনেকেই জানেন না যে, সবজি ও ফলমূল কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। যে কারণে তা দ্রুত পচে যায় বা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে।

বছরে ৬৫ কোটি ঘনমিটার গ্যাস অপচয় (সিস্টেম লস) : বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ও জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্যানুযায়ী গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও অদক্ষতার কারণে বছরে ৬৫ কোটি ঘনমিটার গ্যাস অপচয় (সিস্টেম লস) হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ, অনুমোদনের চেয়ে বেশি ব্যবহার ও পাইপলাইনে লিকেজের (ছিদ্র) কারণে গ্যাস অপচয় হচ্ছে নিয়মিত।

জানা গেছে, গ্যাস অপচয় (সিস্টেম লস) বন্ধ করে হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। অথচ চুরি বন্ধে কার্যকর তেমন কোনো উদ্যোগ না নিয়ে ঘাটতি মেটাতে সরকার চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে প্রতি ঘনমিটার এলএনজির আমদানিখরচ বর্তমানে ৫০ টাকা। সে অনুযায়ী বছরে অপচয় হওয়া ৬৫ কোটি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। তবে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ‘সিস্টেম লস’ গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয়। ফলে অপচয় হয় মূলত সাড়ে ৫৮ কোটি ঘনমিটার গ্যাস। এতে আর্থিক ক্ষতি হয় ২ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা, অপচয় কমিয়ে যা সাশ্রয় করা সম্ভব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অপচয়ের তেমন কোনো কারণ নেই। পাইপলাইন থেকে গ্যাস বের হয়ে যাওয়ার তো সুযোগ নেই। তবে পাইপলাইনে নানা কারণে ছিদ্র তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে এতে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ২০ থেকে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ গ্যাস অপচয় হতে পারে। কাগজ-কলমের হিসাবের চেয়ে গ্যাসের প্রকৃত অপচয় আরও বেশি। অনেক গ্রাহক কম গ্যাস ব্যবহার করে বাড়তি বিল দিচ্ছেন, যার ফলে অপচয় কমিয়ে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এভাবে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে।

অথচ জ্বালানি সাশ্রয়, সংরক্ষণ ও জ্বালানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে ২০১৬ সালে একটি মহাপরিকল্পনা নেয় সরকার। এতে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ ও ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। এটি সফল করতে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক তহবিল গঠন করে স্বল্প সুদে ব্যবসায়ীদের ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া শিল্পে গ্যাসসংযোগ নিতে হলে কারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়। গত বছর পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ে মাত্র ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে।

ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় গঠিত কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বৈধ গ্রাহকারা বাড়তি বিল দেওয়ায় অপচয় কম দেখা যাচ্ছে। চুরি ছাড়া গ্যাস অপচয়ের তেমন সুযোগ নেই। অবৈধ গ্রাহকদের মাধ্যমে এটি হচ্ছে। অপচয়ের বড় অংশ হয় চুরি থেকে, আর বাকিটা লিকেজ থেকে। চুরি বন্ধ করে হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব।

ঢাকায় প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার পানি অপচয় হয় : গত জুলাই মাসে রাজধানীর স্থানীয় একটি হোটেলে ঢাকা ওয়াসার ‘এলাকাভিত্তিক পানির মূল্য নির্ধারণবিষয়ক টেকনিক্যাল স্টাডির (কারিগরি গবেষণা) ফল’ অনুষ্ঠানে তথ্য দেওয়া হয়- ‘ঢাকা শহরে প্রতিদিন ২১০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি লিটার পানি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ৫০ কোটি লিটার পানি অপচয় হয়।’ এ নিয়ে ওয়াসার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ‘এই পানি অপচয় না হলে বিল আরও কম হতো। এই ৫০ কোটি লিটার পানি দিয়ে আরও ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ লোকর পানির চাহিদা মেটানো যেত।’

রাজধানীর পানি সরবরাহকারী সংস্থা ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি ১ হাজার লিটার পানি উৎপাদনে ব্যয় হয় ২৫ থেকে ২৬ টাকা। আবাসিক গ্রাহকদের কাছে ১ হাজার লিটার পানি ১৫ টাকা ১৮ পয়সায়, আর বাণিজ্যিক গ্রাহকদের কাছে ৪২ টাকায় বিক্রি করা হয়।

advertisement