advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন ছিলেন আমাদের শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ

অদ্বৈত মারুত
৩০ অক্টোবর ২০২২ ০৮:৪৯ পিএম | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২২ ০৮:৪৯ পিএম
advertisement

‘ঐ দেখা যায় তালগাছ/ ঐ আমাদের গাঁ/ ঐ খানেতে বাস করে/ কানা বগীর ছা/ ও বগী তুই খাস কি/ পান্তাভাত চাস কি/ পান্তা আমি খাই না/ পুঁটিমাছ পাই না/ একটা যদি পাই/ অমনি ধরে গাপুস-গুপুস খাই।’ শিশুবোধসম্পন্ন এ ছড়াটির রচয়িতা আমাদের শিশুসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন। আজ তার জন্মদিন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ অক্টোবর তিনি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার চারিগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

বাংলায় মুসলিম জাতীয় চেতনার উন্মেষকালে যে কয়েকজন মুসলিম সাহিত্যিক স্বসম্প্রদায়ের ইতিহাসে ঐতিহ্যের সন্ধান করেছেন, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন ছিলেন তাদেরই একজন। জন্ম নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা-মাকে হারান শৈশবেই। তার কোনো ভূসম্পত্তি বা অন্য কোনো ধরনের সহায় সম্পদ ছিল না। ফলে তখন লেখাপড়া দ্বিতীয় শ্রেণির বেশি এগোয়নি। অভাব দৌড়গোড়ায় কড়া নাড়া শুরু করলে এতটুকু বিদ্যাশিক্ষা নিয়ে জীবিকার প্রয়োজনে চলে যান কলকাতায়। কাজ করেন বইবাঁধাই কর্মী হিসেবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মনোনিবেশ করেন বিদ্যাচর্চায়। পড়াশোনা করেন নৈশকালীন বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে কলকাতা করপোরেশন শিক্ষণ প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীকালে কলকাতা করপোরেশন ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানে কাজ করেন ২০ বছর। শিক্ষকতা করতে গিয়েই হয়তো তিনি শিশুদের জন্য লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

advertisement

তবে খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীনের বয়স যখন ২২ বছর, ‘সহচর’ পত্রিকায় গল্পপ্রকাশের মধ্য দিয়ে (বয়স্কদের জন্য পাঠ্য গল্প) লেখক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। তার প্রথম শিশুপাঠ্য গ্রন্থ ‘মুসলিম বীরঙ্গনা’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে। এটি একটি জীবনকথামূলক গ্রন্থ। পরবর্তীকালে তার আরও ৩টি জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

advertisement 4

মঈনুদ্দীন সাংবাদিকতা করেছেন, জেল খেটেছেন। ছিলেন সাপ্তাহিক ‘মুসলিম জগত’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। পত্রিকায় ‘বিদ্রোহ’ শীর্ষক একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের দায়ে তিনি কারাভোগ করেন। হুগলিতে জেলজীবনের সময় সাক্ষাৎ ঘটে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। গড়ে ওঠে দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। দেশবিভাগের পর মুহম্মদ মঈনুদ্দীন চলে আসেন ঢাকায়। গড়ে তোলেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘আলহামরা লাইব্রেরি’। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশ করতেন তিনি এখান থেকেই।

মঈনুদ্দীন শিশুসাহিত্যিক হিসেবেই বেশি খ্যাতি লাভ করেন এবং শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থ হলো মুসলিম বীরাঙ্গনা (১৯৩৬), আমাদের নবী (১৯৪১), ডা. শফিকের মোটর বোট (১৯৪৯), খোলাফা-ই-রাশেদীন (১৯৫১), আরব্য রজনী (১৯৫৭), বাবা আদম (১৯৫৮), স্বপন দেখি (১৯৫৯), লাল মোরগ (১৯৬১), শাপলা ফুল (১৯৬২)। লিখেছেন কবিতা, গল্প ও উপন্যাসও। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কবিতাÑ পালের নাও (১৯৫৬), হে মানুষ (১৯৫৮), আর্তনাদ (১৯৫৮); উপন্যাস, অনাথিনী (সহচর পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত, ১৯২৬), নয়া সড়ক (১৯৬৭); ছোটগল্প, ঝুমকোলতা (১৯৫৬)। যুগস্রষ্টা নজরুল (১৯৫৭) শিরোনামে জীবনীগ্রন্থও রচনা করেন তিনি। খ্যাতিমান কবি হিসেবে শিশুদের জন্য ‘শিশুবোধসম্পন্ন’ ছড়া লিখেছেন তিনি।

খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ছাড়াও যুগস্রষ্টা নজরুল রচনার জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬০) এবং একুশে পদক (১৯৭৮) লাভ করেন।

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলা শিশুসাহিত্যের এই বিশিষ্ট লেখক মৃত্যুবরণ করেন।

অদ্বৈত মারুত: শিশুসাহিত্যিক, কবি ও সাংবাদিক

advertisement