advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বর্জ্য থেকে হোক বিদ্যুৎ ও সার

শাইখ সিরাজ
২২ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২২ ১০:০৫ এএম
advertisement

আমার শহর ঢাকা। এ শহরেই আমার বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য থেকে বর্তমান এ শহরেই আমার যাপন। আজকের ঢাকার মতো ছিল না আমার বেড়ে ওঠার সময়ের ঢাকা। এ ছিল অন্য রকম এক সৌন্দর্যের শহর। এই শহর মানুষকে প্রাণ দিত, উচ্ছলতা দিত। দূর শহর থেকে কিংবা গ্রাম থেকে আসা মানুষ এ শহরের আলো-বাতাসে চঞ্চল হয়ে উঠত। প্রত্যেকের মধ্যে ছিল প্রাণের ঝঙ্কার। ক্রমেই বাড়তে থাকল শহরে মানুষের সংখ্যা। আর মানুষ দূরে সরে যেতে থাকল একে অন্যের থেকে। বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা ২ কোটির ওপরে। ২ কোটি মানুষ ঢাকা শহরটিকে পরিণত করেছে বর্জ্যরে নগরীতে। যে যেখানে পারছে ময়লা-আবর্জনা ফেলছে। আবর্জনা যে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হয়, সেটিই অধিকাংশের শিক্ষার মধ্যে নেই। রাস্তাঘাট, পার্ক, খোলা জায়গা হয়ে উঠেছে ডাস্টবিন।

২০১৬ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন প্রায় ১১ হাজার মিনিডাস্টবিন বসিয়েছিল রাস্তার পাশে। আমি ভেবেছিলাম- যাক, এবার নিশ্চয়ই রাস্তাঘাটের চিত্র বদলাবে। কিন্তু আমার সে চিন্তা ছিল ভুল। বছর দুয়েকের মধ্যেই মিনিডাস্টবিনগুলোকে আমরা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি। একটা অনভ্যস্ত জাতিকে অভ্যস্ত করা খুব কঠিন বিষয়। সেটি শুরু করতে হবে পরিবার ও স্কুল থেকে। আমি চীনে দেখেছি এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে হোটেল ও বাসাবাড়িতে দুই ধরনের ডাস্টবিন থাকে। একটায় ফেলা হয় জৈববর্জ্য আর অন্যটায় অজৈব। জৈববর্জ্য ব্যবহার করা হয় সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। আর অজৈব বর্জ্য বাছাই করে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে শিল্পের কাঁচামালে রূপান্তর করা হয়। অবশ্য ঢাকা সিটি করপোরেশন ও কয়েকটি এনজিওকে এই ধরনের উদ্যোগ নিতে দেখেছিলাম।

advertisement

পুরো পৃথিবীই এখন শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিন্তিত। কৃষি খাতে, বিশেষ করে পোলট্রিশিল্পের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিকভাবে এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করতে পারলে অল্পদিনেই পোলট্রি খামার পরিবেশের জন্য যেমন বিরূপ হয়ে ওঠে, একইভাবে বিরূপ হয়ে ওঠে পোলট্রির জন্যও। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে অথবা ব্যবস্থাপনা না করার কারণে খামারের মুরগি নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তবে অনেক কৃষক ও খামারি পোলট্রি বর্জ্য সংরক্ষণ করে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর জৈবসার হিসেবে তা আবাদি ক্ষেতে ব্যবহার করেন। অনেকে পোলট্রি বর্জ্যকে কেঁচো সারের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রায় বছর দশ-বারো আগে ঢাকার বেরাইদে স্থাপিত আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় পোলট্রি খামার ওমেগা পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চালু করে। অবশ্য সেটি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় না হলেও ছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর উদ্যোগ।

advertisement 4

পোলট্রি বর্জ্য থেকে জৈবসার বা বায়োগ্যাস উৎপাদন পুরনো খবর। বায়োগ্যাস নিয়ে কাজ করেছি বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে দশকে। সে সময় বিটিভিতে বায়োগ্যাস প্লান্ট নিয়ে ডজনখানেক প্রতিবেদন প্রচার করেছিলাম। ফলে একটা বিশাল জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়েছে। সে সময় গ্রামীণ গৃহস্থালির জ্বালানির সংকট ছিল। এখন তো গ্যাস সিলিন্ডার চলে গেছে প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতেও। নব্বইয়ের দশকে যখন বায়োগ্যাস প্লান্ট বিষয়টাকে তুলে ধরলাম, তখন মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। একটা গৃহস্থ পরিবারে যদি পাঁচটি গরু থাকে, সেই গরুর প্রতিদিনের যে গোবর আসে- সেই গোবর থেকে বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে দুই বেলা রান্না, বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি পাওয়া পাওয়া যায় স্লারি; যা উৎকৃষ্টমানের জৈবসার। সেই প্রতিবেদনগুলো প্রচারের পর প্রচুর চিঠি আসত বিস্তারিত জানার জন্য। বিসিএসআইআরের জ্বালানি গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক আখতারুজ্জামানের দপ্তরে দেখেছিলাম বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণের অসংখ্য নির্দেশিকা। সেগুলো আমি নিয়ে এলাম। অনুষ্ঠানের এক পর্বে বলে দিলাম- যারা বিস্তারিত জানতে চান, তারা যেন চিঠির সঙ্গে নিজের ঠিকানাসহ ডাকটিকিট সংবলিত একটা খালি খাম পাঠান। প্রতিদিন হাজার হাজার চিঠি আসত। আমি আর আমার স্ত্রী শাহানা মিলে সেসব খামে ভরে ব্যাগে করে দিয়ে আসতাম বাসার পাশের খিলগাঁও পোস্ট অফিসে।

এই সময়ের ভেতর পৃথিবী বদলেছে অনেকখানি। হাজারগুণ গতিতে এগিয়েছে বিজ্ঞান। কিন্তু জৈব জ্বালানির বিকল্প পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ কোনো প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি- যার কারণে উন্নত দেশগুলোও জৈব পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকেছে। এর গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক আছে। এক. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দুই. জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

মনে পড়ে, আশির দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময় নাভানা গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মিউনিসিপ্যাল বর্জকে একটি বদ্ধ হাউসে মিডিয়াম মিশ্রণ করে জৈবসার বানানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। বন্ধু কৃষিবিদ ড. সদরুল আমিন এ প্রকল্পটিতে কাজ করতেন। তার অনুরোধে তখন বিটিভির ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে প্রচার করেছিলাম। ভেবেছিলাম, এবার বাঁচা যাবে- মিউনিসিপ্যাল বর্জ্য বোধহয় সম্পদে রূপ নেবে, অন্যদিকে শহরের পরিবেশ রক্ষা পাবে। কিন্তু এত বছর হয়ে গেল, ঢাকা শহরের আবর্জনা আবর্জনাই রয়ে গেল। অথচ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কাছে এ বর্জ্যই সম্পদ।

২০০৫ সালে জাপানের মরিওকায় অবস্থিত কইওয়াই অর্গানিক ফার্মে প্রথম বড় আকারের বায়োগ্যাস প্লান্টের ওপর প্রতিবেদন ধারণ করেছিলাম। ২০১৬ সালে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে দেখিয়েছিলাম, জার্মানির জেলসনে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এক জৈববিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র- যেখানে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় প্রধানত শস্যদানা। খাদ্য সংকট না থাকায় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ শস্যদানা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়। ২০১৮ সালে আমাদের দেশে প্যারাগন পোলট্রি লিমিটেড গাজীপুরের বানিয়াচরা গ্রামে সম্পূর্ণ পোলট্রি বর্জ্যকে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠা করে জৈব পাওয়ার প্লান্ট। প্যারাগন পোলট্রির স্বত্বাধিকারী মশিউর রহমান বলেছিলেন, তার আড়াই লাখ পোলট্রির বর্জ্য নিয়ে বিপাকে ছিলেন। প্রথমে ছোট ছোট কুয়া করে সেগুলোকে পুঁতে ফেললেও পরে দেখলেন এ বর্জ্যই হয়ে উঠছে তার খামারের পোলট্রির জন্য বিপজ্জনক ও ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়। লাগছে অনেক লোকবল। অনেকটা খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। সমাধান পেয়েছেন ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর প্রতিবেদন দেখে। তিনিও উদ্যোগ নিলেন জৈব পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের। ফলে আড়াই লাখ পোলট্রির বর্জ্য থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ৩৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। এতে মেটাতে সক্ষম হচ্ছেন তার খামারের ১৪ ঘণ্টার বিদ্যুতের চাহিদা। এর পাশাপাশি উৎপাদিত জৈবসার ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন ফল-ফসলের চাষে। এ ব্যবস্থাপনাটি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা হওয়ায় শ্রমিক খরচ নেই বললেই চলে। জার্মানির জেলসনের জৈববিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রেও একই চিত্র দেখেছিলাম। ওই কোম্পানির দুজন মালিক দুই বন্ধু পিপা ও পাপে। তারাই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক থেকে মালিকের পুরো দায়িত্ব সামলান। সবখানেই এখন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটিই অনুসরণ করা হয়। ২০১৬ সালে পোলট্রিশিল্পের উৎকর্ষ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে চীনের শ্যাংডং প্রদেশেও একই চিত্র দেখেছি। সেখানে বড় বড় পোলট্রি খামার ও সংরক্ষিত মাতৃখামারগুলো পরিচালিত হচ্ছে একেবারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। বিশাল বিশাল শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে একজন বা সর্বোচ্চ দুজনের মাধ্যমে। বেশকিছু পোলট্রি খামারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক ব্যবস্থাও দেখেছিলাম। প্যারাগনের স্বত্বাধিকারী মশিউর রহমান জানিয়েছিলেন, পোলট্রিশিল্পের সঙ্গে এমন একটি জৈববিদ্যুৎ প্রকল্প সংযুক্ত করে দেওয়ায় বহুভাবে লাভবান হচ্ছেন তিনি।

এ বছর গাজীপুরের শ্রীপুরে ডায়মন্ড এগ লিমিটেডের বড় খামার পরিদর্শন করে দেখেছি, পোলট্রি বর্জ্য থেকে তারা জৈবসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সেই সার একটা বেসরকারি কোম্পানি কিনে নিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডে বাজারজাত করছে। বড় পোলট্রি খামারগুলো যদি এ ব্যবস্থা অনুসরণ করে, তা হলে তারা তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমাদের জাতীয় গ্রিডেও সংযুক্ত করতে পারবে।

বছরতিনেক আগে যশোরে বর্জ্য থেকে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছিল। এডিবির সহায়তায় বর্জ্য থেকে সার ও বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প স্থাপিত হয় সেখানে। এডিবির প্রকল্পের আওতায় বর্জ্য থেকেই উৎপাদন হচ্ছে সার ও বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ। অন্য পৌরসভাগুলোও এ বিষয়টিকে অনসুরণ করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী কৃষি খামারের ব্যবস্থাপনাটি এখন মিলিত হয়েছে শিল্প ব্যবস্থাপনার সঙ্গে। কৃষিশিল্প উদ্যোক্তারা চাইছেন একটি শিল্পপণ্যকে বহু শিল্পপণ্যে রূপ দিতে। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রকুশলীর উৎকর্ষে তা সম্ভবও হচ্ছে সহজে। শুধু পোলট্রিশিল্প নয়, সব ধরনের জৈববর্জ্য থেকেই সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন। আমরা যদি সচেতন হই, তা হলে বর্জ্যই খুলে দিতে পারে অমিত সম্ভাবনার দ্বার। একই সঙ্গে পাওয়া যেতে পারে উৎকৃষ্টমানের জৈবসার। মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনার জন্য জৈবসারই এখন কৃষকের প্রধান ভরসা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের সবার সুঅভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে নিশ্চিত হবে পরিচ্ছন্নতা, বাঁচবে পরিবেশ।

 

শাইখ সিরাজ : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

advertisement