advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আলী ইমাম প্রচ- কর্মবীর মানুষ ছিলেন

ফরিদুর রেজা সাগর
২৩ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২২ ১১:৪৮ পিএম
advertisement

আমীরুল যখন জানাল তারিক সুজাতের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জার্নিম্যান থেকে আলী ইমামের একটা সুদৃশ্য মনোরম বই প্রকাশিত হয়েছে। তখন প্রথমেই আমার মনে হলো, তারিক সুজাতের জার্নিম্যান থেকে চমৎকার একটা বই কবে বের হবে? আলী ইমামের বই ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ এখনো চোখে দেখিনি। তবে অনুমান করি লেখা যেমন সুন্দর হবে, তেমনই বইটাও অসাধারণ হবে এর মুদ্রণ সৌকর্যে।

advertisement

তার পর আমীরুল বলল, তারিক সুজাত বইটা নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গেছে। আলী ইমাম ভয়াবহ অসুস্থ। শুভ্র বিছানায় শায়িত। আপাতত চলৎশক্তিহীন। বইটা তার সামনে মেলে ধরেছে তারিক সুজাত। আলী ইমাম ভাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছে বইটার দিকে। সেই মুহূর্তে তার চোখ দুটো উজ্জ্বলতায় চিকচিক করে উঠেছে। কিন্তু আলী ইমামের আনন্দের পরিমাণটা বোঝা যায়নি। তারিক বইটা দ্রুততার সঙ্গে প্রকাশ করেছে। শুধু বইটা আলী ইমামকে দেখানোর জন্য এই দ্রুততা। তবে অনুমান করি বাবা যেমন নিজ সন্তানকে কাছে পেলে খুশি হয়ে ওঠে, আদর করে- আলী ইমামও তাই করেছেন।

advertisement 4

আমার তখন মনে পড়ে গেল পুরনো দিনের কথা। আলী ইমামের প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৬ সালে। বইয়ের নাম দ্বীপের নাম মধুবুনিয়া। প্রকাশক বর্ণমিছিল। খুব অসাধারণ ছাপা। সাধারণ প্রচ্ছদ। কিন্তু আমাদের কাছে তখন সেটা অসাধারণ ব্যাপার। প্রথম বই। আমরা প্রত্যেকে আনন্দিত। বইয়ের প্রচ্ছদে ফ্ল্যাপ লিখে দিয়েছেন কবি শামসুর রাহমান। তার পর আলী ইমামের একের পর এক ৬০০-এর অধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। আমার মনে হয়, আলী ইমামের মতো এত অধিকসংখ্যক বই দুই বাংলায় আর কারও নেই।

প্রচ- কর্মবীর মানুষ আলী ইমাম। একই সঙ্গে দুই হাতে লিখছেন। একই সঙ্গে টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ করছেন। কখনো অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে ছুটছেন। আশ্চর্য রকমের পরিশ্রমী তিনি। দ্রুত কাজ করার ক্ষমতাও তীব্র। এমন ক্ষমতা আর কারও আছে কিনা জানি না। বাংলাদেশ টেলিভিশনে অসংখ্য লাইভ অনুষ্ঠানের প্রযোজক তিনি। অনেক অনুষ্ঠান আছে যে অনুষ্ঠানে প্রচারের সময় মিউজিক যুক্ত হয় কিংবা কোনো নাটকের সংলাপ সরাসরি প্রচার হয়েছে। কিন্তু আমার মনে পড়ে আলী ইমাম ৪০ মিনিটের একটা প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেছেন সুন্দরবনের ওপর। এডিটিং করতে দেরি হয়ে যায়। তখন আলী ইমাম অনএয়ারে সুন্দরবন সম্পর্কে ধারা বর্ণনা দিয়ে যান অনর্গল। বিটিভিতে এমন ঘটনা আলী ইমামের পক্ষেই সম্ভব। বিটিভির যে কোনো অনুষ্ঠান সম্পর্কেই আলী ইমামের স্বচ্ছ ধারণা ছিল। তিনি যেমন অসংখ্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন, তেমনি অসংখ্য অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য কখনো তাকে সুট-প্যান্ট বা পাজামা-পাঞ্জাবি পরতে দেখিনি। তিনি সাধারণভাবে যে প্যান্ট বা হাওয়াই শার্ট পরে আছেন তাই পরেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন। শুধু এলোমেলো অবাধ্য চুলগুলো ঠিক করে নিতেন। সাধারণ ভঙ্গিতে কত যে অসাধারণ কথা বলেছেন অনএয়ারে তার হিসাব নেই।

আলী ইমামের দ্বিতীয় বই ‘অপারেশন কাঁকনপুর’। কিশোরবাংলা ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। বই বের হয় ১৯৭৯ সালে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তখন রোববারে এ সপ্তাহের নাটক প্রচারিত হতো। খুব জনপ্রিয় ছিল সপ্তাহের নাটক। সেই স্লটে অপারেশন কাঁকনপুর নাটক হিসেবে প্রচারিত হয়। নাটকটি প্রযোজনা করেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। নাট্যরূপ দেন বিখ্যাত নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদ। সেই প্রথম বড়দের স্লটে ছোটদের নাটক প্রচারিত হয়। ছোটদের অনুষ্ঠান প্রচার হয় সাধারণত বিকালে। কিন্তু নাটকটি প্রাইমটাইমে প্রচার হয়। সে যুগে ব্যাপারটা অনেক বড়। আজকাল ঈদ বা পূজা সংখ্যায় ছোটদের উপযোগী উপন্যাস বা কোনো লেখা ছাপা হয়। বিটিভিতে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই অপারেশন কাঁকনপুর প্রচারিত হয়েছিল।

আলী ইমামের সঙ্গে প্রথম কবে দেখা হয়েছিল? স্পষ্ট মনে পড়ে ডিআইটির বারান্দায়। তখন ঢাকা কেন্দ্র টেলিভিশনের কার্যালয় ছিল ডিআইটি ভবনে। তখন ‘অমর কাহিনি’ নামে একটা সিরিজ নাটক প্রচার হতো। শিশু-কিশোরদের উপযোগী নাটক। প্রযোজনা করতেন খালেদা ফাহমী। এই সিরিজের একটা পর্ব ছিল কলম্বাস। কলম্বাসের ছেলেবেলার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডাক পড়েছে আমার। মূল চরিত্রে অভিনয় করেন ঢাকার চলচ্চিত্রের খলনায়ক বাবর। কলম্বাসই ছিল তার অভিনীত প্রথম টিভি নাটক। চিত্রপরিচালক ছোটকু আহমেদের ছোট ভাই দোদুল আহমেদও সেই নাটকে অভিনয় করেন। তখন সেই ষাট দশকের মাঝামাঝি এসব অনুষ্ঠানও সরাসরি প্রচার হতো। একদিন বিকালে বাবার সঙ্গে বিটিভিতে যাই নাটকের স্ক্রিপ্ট আনতে। হাতের লেখা পা-ুলিপি। স্পষ্ট ঝকঝকে হাতের লেখা। পরদিন রিহার্সেল হতো। রিহার্সেল দেখার জন্য এলেন মুস্তাফা মনোয়ার। প্রযোজক খালেদা ফাহমী তো ছিলেনই। প্রথম রিহার্সেলের সময় দেখলাম একজন তরুণ একটু দূরে চুপচাপ বসে আছেন। তিনি কোনো অভিনয়ে অংশ নিলেন না। রিহার্সেল শেষে প্রযোজক খালেদা ফাহমী পরিচয় করিয়ে দিলেন, এই হচ্ছে নাট্যকার। ইনার নাম আলী ইমাম। আলী ইমামের নামের সঙ্গে আমি খুবই পরিচিত। দৈনিক ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে তার লেখা নিয়মিত ছাপা হয়। আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে সে কথা তাকে জানালাম। আলী ইমাম তখন ততোধিক উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন, তোমার ছবি ‘প্রেসিডেন্ট’ মুক্তি পাওয়ার পর গুলিস্তানে আমি লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে দেখেছি। আমাদের দেশে প্রথম ছোটদের ছবি। প্রথমদিনেই আমরা পরস্পরের আপন হয়ে গেলাম।

আলী ইমাম ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের বয়সী সবারই অনেক অনেক স্মৃতি। তিনি সব বয়সী মানুষের বন্ধু হতে পারেন। এ এক আশ্চর্য গুণাবলি। আলী ইমামের সঙ্গে এত স্মৃতি। কোনটা রেখে কোনটা লিখি। লিখতে লিখতে পত্রিকার পাতা ফুরিয়ে যাবে কিন্তু স্মৃতি শেষ হবে না।

আলী ইমাম নিজেকে টেলিভিশন ও লেখালেখির বাইরে অনেক কাজে সংযুক্ত রাখতেন। কচিকাঁচার মেলা, চাঁদের হাট, শিশুসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা নগর জাদুঘর, গণহত্যা জাদুঘর- নানা সংগঠনে তিনি কাজ করে থাকেন। মন্তাজ নামে প্রথমদিকের একটা সিনে ক্লাব তৈরি করেন তারা। চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গেও ছিলেন। ভারতীয় দূতাবাসে চলচ্চিত্র কোর্সে সতীশ বাহাদুরের কাছে হাতে-কলমে ট্রেনিং নেন। সেই কোর্সে সবচেয়ে উজ্জ্বল ফলাফল ছিল আলী ইমামের। জনপ্রিয় ‘এপার ওপার’ ছবির চিত্রনাট্য তার লেখা। সত্যজিৎ রায়ের অসম্ভব ভক্ত তিনি। পুরো জীবনে তিনি সত্যজিৎ চর্চা করেছেন। রুপোলি ফিতে নামে চলচ্চিত্রের বই লিখেছেন। আর সত্যজিৎ রায়ের ওপর দশ-বারোটা বই লিখেছেন। এমনই চলচ্চিত্রপাগল আলী ইমাম।

একসঙ্গে কত স্মৃতির ভেতর চলে যাচ্ছি আমরা। গত সোমবার তিনি আমাদের রেখে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আলী ইমামের বিশাল কর্মময় জীবনের কথা, তার প্রতিভার কথা নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই জানানো প্রয়োজন।

ফরিদুর রেজা সাগর : শিশুসাহিত্যিক

advertisement