advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে সড়কের ৬২ শতাংশ

শাহজাহান মোল্লা
২৪ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২২ ১১:১৮ এএম
advertisement

রাজধানীতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষ। বাড়ছে পরিবহনও। কিন্তু নগরবাসীর জন্য যে ধরনের পরিবহন বাড়ানো আবশ্যক, সেসব পরিবহন বাড়ছে না। বাড়ছে এমন সব যান, যা খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ ব্যবহার করেন অথচ রাজধানীর রাজপথের অনেকটাই এসব যানের দখলে। একটি পরিসংখ্যানেই ধারণা পাওয়া যায়, বিষয়টি এ মেট্রোপলিটন সিটির জন্য কতটা উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) তুলে ধরা তথ্য মতে, ঢাকা নগরীতে ৫ শতাংশ লোকের ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়ি সড়কের ৬১.৯৯ শতাংশ জায়গা দখল করে রাখে। অথচ যাত্রী বহন করে মাত্র ১৮.২৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৬০.৩৬ শতাংশ যাত্রী বহনকারী গণপরিবহনের দখলে সড়কের মাত্র ১.১২ শতাংশ। অন্যান্য পরিবহনের দখলে ৩৬.৮৯ শতাংশ, যেগুলো ২১.৩৮ শতাংশ যাত্রী বহন করে।

advertisement

২০১০ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ সময়কালে গণপরিবহন অর্থাৎ বাসের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে খুবই কম। এই ১৩ বছরে বাস নেমেছে ৩৯ হাজার ২৩৭টি। অন্যদিকে ৯০ হাজার ২৮৫টি মাইক্রোবাস, ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮০৯টি প্রাইভেটকার, ১০ লাখ ৬৫টি মোটরসাইকেল নেমেছে। এছাড়া অন্যান্য ছোট গাড়ী মিলে ঢাকা মেট্র্রোপলিটন এলাকায় মোট গাড়ী নেমেছে ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৩টি। বিআরটিএর তথ্যানুসারে, রাজধানীর সড়কে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে ১৫০টি ব্যক্তিগত গাড়ী।

advertisement 4

ড্যাপের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৩৫ সালে ব্যক্তিগত গাড়ীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৩ লাখ ৬০ হাজারে। এ বিপুল সংখ্যক গাড়ির স্রেফ পার্কিংয়েই প্রয়োজন হবে প্রায় ৩.৬ বর্র্গকিলোমিটার স্থান অর্থাৎ গুলশান ও বনানীর প্রায় পুরো এলাকার সমান জায়গা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ থেকে উত্তরণে শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে যেন ব্যক্তিগত গাড়ীর প্রতি আগ্রহ হ্রাস হায়। এক্ষেত্রে উচ্চকর, উচ্চ পার্কিং মূল্য ছাড়াও অন্যান্য শর্তাদিতে কঠোরতা প্রয়োগ করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ী বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। সেক্ষেত্রে ২০৩৫ সাল অবধি ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা আড়াই লাখের মধ্যেই থাকবে।

এ বিষয়ে নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক আমাদের সময়কে বলেন, পুরো বিশ^ব্যাপী ‘কার’ হলো কারস (অভিশাপ)। একটা গাড়ি চলার জন্য জায়গা চায়, থামার জায়গা চায়। এগুলোর স্থান সংকুলান করা সম্ভব নয়। এগুলো যানজট বাড়িয়ে দেয়। টেকসই উন্নয়নের যুগে হাঁটাপথগুলো যদি পথচারী-বান্ধব করা যায়, তাহলে ২ থেকে ২.৫০ কিলোমটার দুরত্বে যেতে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষই হাঁটাপথ বেছে নেবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের এ অধ্যাপক আরও বলেন, জ্বালানিমুক্ত পরিবেশবান্ধব হাঁটাপথের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা; দূরত্ব আরেকটু বেশি হলে বাইসাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলেই শহর হবে বাসযোগ্য। পিকআওয়ারে যাত্রীবহনে গণপরিবহনকে গুরুত্ব দিতে হবে। নয়তো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটাই পরীক্ষিত সত্য। যারা সফল হয়েছে, তারা এমনটাই করেছে। ড্যাপ এভাবে ভাবলে, কিছু করতে পারলে ভালো হবে। তিনি পাশাপাশি এও বলেন, রাজধানীর ভূমি ব্যবহারের বর্তমান চিত্রে এটি দূরহ।

রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, রেগুলার ট্রিপ জেনারেটিংয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৪০ শতাংশ ট্রিপ মানুষ হেঁটেই সম্পন্ন করে। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ মানুষের নির্ভরতা গণপরিবহনে বা পাবলিক বাসে। এরপর রয়েছে ট্রেন সার্ভিসে। এমআরটি লাইনে ট্রিপের বিষয়ে বলা আছে, সর্র্বোচ্চ ১০-১৫ শতাংশ ট্রিপ জেনারেট করবে। পৃথিবীর উন্নত সব শহরেরই ডিজাইন এমনভাবে করা হয় যেন মানুষ স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে হেঁটে যেতে পারে। সেজন্য ফুটপাতের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ফুটপাতগুলোতে হাঁটার পরিবেশ করতে পারলে বর্তমান অচলবস্থা কেটে যাবে।

সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা ২০১৫-২০৩৫ এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরো রাজউক এলাকার বড় অংশ, যাদের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকার নিচে তাদের প্রায় ৬০ শতাংশের যাতায়াত হাঁটার মাধ্যমে হয়ে থাকে। এমআরটি লাইন বা মেট্রোরেল মোট ট্রিপের মাত্র ১০-১৫ শতাংশ বহন করবে। অবশিষ্ট ৮৫ শতাংশ ট্রিপ জেনারেটের ক্ষেত্রে হাঁটাপথের প্রতি খুবই গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর থাকবে পাবলিক বাস, এরও পরে রেল ও নৌপথের ব্যবস্থা।

এতে আরো দেখা গেছে, রাজধানীতে চলাচলকারী যাত্রীদের মধ্যে মোট যাত্রার ১০-১২ শতাংশ যাতায়াত হয় অযান্ত্রিক যানবাহনে। এছাড়া খসড়া ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫) প্র্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ সমগ্র রাজউক এলাকার এক তৃতীয়াংশ মানুষ হেঁটে চলাচল করবে। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর অযান্ত্রিক যানবাহন এবং পথচারী চলাচলের বড় প্রভাব রয়েছে। কিন্তু আমাদের যে কোনো পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অযান্ত্রিক পরিবহন ব্যবস্থাকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে রাজধানীর রাজপথে অপরিকল্পিতভাবে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগত গাড়ী পার্কিং করা হয়ে থাকে। এ কারণে ভীষণ যানজটের সৃষ্টি হয়। চলমান হারে ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়তে থাকলে ২০৩৫ সালে এসব গাড়ির সংখ্যা হবে তিনগুণ। সেক্ষেত্রে পার্কিংয়ের জন্য সড়কের তিনগুন স্থান দখল করবে। কাজেই যানজট কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তা সহজেই অনুমেয়।

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এলাকায় ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অনানুষ্ঠানিক। এমন মানুষের বেশিরভাগই হেঁটে কর্মস্থলে যায়। কিন্তু বেশিরভাগ রাস্তার ক্ষেত্রেই দেখা যায় পথচারী চলাচলের সুযোগ সুবিধা ঠিকভাবে দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে রয়েছে নানারকম প্রতিবন্ধকতা- ফুটপাত দখল করে গাড়ি পার্কিং, অস্থায়ী দোকান গড়ে তোলা, নির্মাণসামগ্রী রাখা, বিভিন্ন বর্জ্য ফেলা, এমনকি ফুটপাত দখল করে ভাসমান মানুষের অস্থায়ী আবাসও গড়ে উঠছে।

আরএসটিপি অনুযায়ী, ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশন মিলে পুরো রাজউক অঞ্চলের ৮৮ শতাংশ রিকশা চলাচল করে। অথচ বেশিরভাগ রাস্তায় অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য পৃথক কোনো লেন নেই, নেই পার্কিং সুবিধা। ফলে যানজটই শুধু নয়, নানা দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে। সর্বোপরি, সড়ক হারায় এর প্রকৃত কার্র্যকারিতা।

সেজন্য ড্যাপে আন্ত:অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং রিং রোডে সার্ভিস রোডের প্রস্তাবে অযান্ত্রিক যান চলাচলের সুযোগ রাখা হয়েছে। পথচারী চলাচলের জন্য প্রতিটি রাস্তা, খাল বা লেকের পাড়, পার্ক সংলগ্ন স্থানে ফুটপাত বা পথচারীর হেঁটে চলার পথ নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পথচারী চলাচলের জন্য ফুটপাতের বিভিন্ন নকশা ও পরিমাপের নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে।

ড্যাপের পরিকল্পনায় সাইকেলের জন্য লেন করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবিক শহর গড়তে হলে হেঁটে ও সাইকেলে চলার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকা শহরে প্রায় ২ লাখ মানুষ সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করে। তাছাড়া প্রায় ঢাকা শহরের ৯৫ শতাংশ পরিবারেরই ব্যক্তিগত গাড়ী নেই। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যেসব সড়কে সাইকেল লেন করা সম্ভব, সেসব সড়কে এবং খাল বরাবর আলাদা সাইকেলের লেন করার সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকা শহরকে যানজটমুক্ত, কার্যকরী, গতিশীল ও পরিবেশ বান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় সাইকেলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে। স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ২/৩ কিলোমিটার দূরত্বের রাস্তা চাইলে অনায়াসে সাইকেল চালিয়ে যেতে পারবেন ফলে শারীরিক ও মাানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-২০৩৫ ভৌত জরিপ থেকে দেখা যায়, রাজউক এলাকায় মোট ১৩ হাজার ৮৬৫ দশমিক ১ কিলোমিটার রাস্তা বিদ্যমান। এর মধ্যে ৫ ফুট তার চেয়ে কম প্রস্থের রাস্তার পরিমাণ ১ হাজার ৭৮৭ কিলোমিটার। যা মোট রাস্তার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। ৮ ফুট বা ৮ ফুটের নিচে রাস্তার মোট দৈর্র্ঘ্য ৫ হাজার ২২. ৪৩ কিলোমাটার যা মোট রাস্তার ৩৬ দশমিক২৩ শতাংশ। ১০ ফুট বা ১০ ফুটের নিচে রাস্তার মোট দৈর্ঘ্য ৮ হাজার ২৫৮.৩৮ কিলোমিটার। যা মোট রাস্তার ৫৯.৫৮। বিশদ অঞ্চল ২০২২-২০৩৫ ভৌত জরিপ ডেটাবেইজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে ২০ ফুট প্রশস্ত রাস্তার মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজাার ৪৫৬ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার। যা মোট রাস্তার ১০.৫১ শতাাংশ।

বর্তমান সকল যাত্রার ৪০ শতাংশের বেশি যাত্রা শুধুমাত্র বাস পরিসেবা দ্বারা সম্পন্ন করে। এই বাস্তবতা ধরে সকল প্রধান সড়কে হাঁটার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩২০৭ কিলোমিটার সড়কপথ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। জলপথ ৫৭৪ কিলোমিটার, অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের পথ ১২৩৩ কিলোমিটার, সাইকেল লেন ২০২ কিলোমিটার করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

advertisement