advertisement
advertisement
advertisement

নায়ক রাজ্জাক : চলচ্চিত্রে নিবেদিত এক প্রাণ

ফরিদুর রেজা সাগর
২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ০৮:৩২ এএম
advertisement

নায়করাজ রাজ্জাকের ৮১তম জন্মদিন আজ। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ নায়করাজ রাজ্জাক। রাজ্জাক অভিনীত প্রথম ছবি দেখি আমি কিশোর বয়সে। নাম ছিল ‘ছদ্মবেশী’। ক্যামেরাম্যান কিউ এম জামান পরিচালিত এই ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭০ সালে। ছবিতে একটি গাড়ি ছিল। সেটা পানিতেও চলত, ডাঙায়ও চলত। গাড়িটি চালিয়েছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। সেই প্রথম আমাদের কিশোর মনে দাগ কাটল যে, এ রকম একটা গাড়ি আর এ রকম একজন নায়ক। শুনলাম এই গাড়িটি তার। ফলে আরও এক ডিগ্রি বেড়ে গেল শ্রদ্ধা-ভক্তি। বাপরে বাপ এ রকম একটা গাড়ি চালায়! আরও কিছুদিন পরে শুনলাম যে, তিনি গুলশানে একটা বাড়ি তৈরি করবেন, বাড়ির ভেতরে থাকবে একটা সুইমিংপুল। সবকিছু মিলিয়ে মনে হলো, সত্যি সত্যি তিনি এক আধুনিক নায়ক।

এক পর্যায়ে শুনলাম, যে স্কুলে আমি পড়ি, সেই স্কুলের কাছাকাছি একটি বাড়িতে রাজ্জাক ভাই থাকেন। ফার্মগেটে। তখন তিনি একটা বিরাট শেবারলেট গাড়ি চালান। তখন ঢাকা শহরে এই ধরনের গাড়ি খুব কম ছিল। লম্বা, বিশাল গাড়ি। সেই গাড়িটি দেখেই আমার এক বন্ধু খবর দিল যে, গাড়িটি যখন এই বাড়িতে তা হলে তিনি এই বাড়িতেই থাকেন। সত্যি সত্যি জানলাম যে, ফার্মগেট এলাকায় তিনি থাকেন। আমরা স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে বহুদিন তার বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম যে কখন নায়ক রাজ্জাক বেরোবেন। এফডিসির গেটের সামনেও দাঁড়িয়ে থাকতাম তাকে একনজর দেখার জন্য।

advertisement

একদিন একটা ছবি রিলিজ হলো, ‘নীল আকাশের নীচে’। স্বাধীনতার আগে, ঈদের ছবি। ঢাকা শহরে এই ছবির সেই সময় টিকিট পাওয়া যাচ্ছিল না। ছবি যদি প্রথমদিকে না দেখি তা হলে তো একটু গ্রামের লোক হয়ে যাব! পিছিয়ে যাব, শুনলাম ছবিটি ডেমরার একটা হলে চলছে, সেখানে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। আমরা বন্ধুরা দলবেঁধে ডেমরার রানীমহল সিনেমা হলে গিয়েছিলাম এই ছবিটি দেখার জন্য।

advertisement 4

‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে একটা হিট গান ছিল। ‘নীল আকাশের নীচে আমি রাস্তা চলেছি একা।’ আমরা একটা ছবি প্রযোজনা করেছিলাম, যে ছবির পরিচালক ছিলেন রাজ্জাক। নায়ক ছিলেন রাজ্জাকের ছেলে সম্রাট। সেই ‘আয়না কাহিনী’তে সম্রাটের মুখে সেই গানটাই ব্যবহার করেছিলেন রাজ্জাক ভাই। চ্যানেল আই অফিসে আমার রুমে বসে পরিকল্পনা করেছিলেন যে, ওই হিট গানটা এখানে ব্যবহার করবেন। আমি খুবই পুলকিত হয়েছিলাম। গানটার স্মৃতি আমার কাছে খুবই স্মরণীয়।

রাজ্জাক ভাই শেষ জন্মদিন করেছেন চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে। শেষ নাটক করেছেন চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে। শেষ চলচ্চিত্র করেছেন চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে। অনেকেই মনে করেন, চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে রাজ্জাক ভাইয়ের সম্পর্ক পুরনো।

আরেকটা কথা বলতে চাই যে, রাজ্জাক ভাই যে মাপের শিল্পী ছিলেন, প্রথম মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‘ওরা এগারো জন’-এ অভিনয় করেছিলেন, সেই রাজ্জাক ভাইকে আমরা শহীদ মিনারে জাতীয় পতাকা দিইনি, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান দিইনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কি যারা যুদ্ধ করেছে শুধু তারা? আমি খুব ভালো করেই জানি পাকিস্তানি সৈন্য তার বাসায় গিয়েছিল, বারবার তাকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে, বলেছে নাটক করতে। তখন টেলিভিশনে নাটক করতে হলে পুরোটা মুখস্থ করতে হতো। রাজ্জাক ভাই রিহার্সেল করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলেছেন, ‘আমি মুখস্থ করতে পারি নাই। আমার পক্ষে মুখস্থ করা সম্ভব নয়। আমি নাটক করতে পারব না।’ তিনি একটি নাটকও করেননি। সেই সময় পাকিস্তানি সেনাদের না-বলাটা জীবনের জন্য অনেক বড় ঝুঁকি ছিল। একাত্তর সালে রাজ্জাক ভাই কোনো নাটক টেলিভিশনে করেননি। বেতারে করেননি। এতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কি তার সমর্থন প্রকাশ পায় না?

আরও একটি কথা, বাংলাদেশ চলচ্চিত্রশিল্পে নেতৃত্ব দেওয়া একটা বিশাল ব্যাপার। সেটা কিন্তু রাজ্জাক ভাই সব সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যে কোনো ব্যাপারে রাজ্জাক ভাইকে সব সময় পেয়েছি। তিনি আমাদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তার মতো একজন বড় নায়ক টেলিভিশনের জন্য কাজ করতে কখনই দ্বিধাবোধ করেননি।

আরেকটা জিনিস না বললেই নয়। তিনি অত্যন্ত গোছানো মানুষ ছিলেন। যে সময় এ দেশের ব্যবসায়ীরা গুলশানে বাড়ি করার কথা চিন্তা করেননি, সেই সময় গুলশানে বাড়ি করার কথা চিন্তা করেছেন তিনি। বাড়িতে সুইমিংপুল করেছেন। আবার যে সময় মনে হয়েছে যে, ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে, সেই সময় বাসা ফ্ল্যাটবাড়িতে রূপান্তর করেছেন। উত্তরায় যখন কেউ যায়নি, তখন তিনি সেখানে রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স করেছেন। আজ সেখানে মিষ্টির দোকানের বেশ ভালো ব্যবসা। তিনি কিন্তু সেখানে আগেই শুরু করেছিলেন ‘আলী বাবা’ নামে একটি মিষ্টির দোকান। সবকিছু মিলিয়ে তার মধ্যে যে দূরদর্শিতা ছিল, এটা অনেক কম শিল্পীর মধ্যে আছে।

 

ফরিদুর রেজা সাগর : শিশুসাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

advertisement