advertisement
advertisement
advertisement.

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কি বন্ধ হয়ে যাবে

গওহার নঈম ওয়ারা
২৬ মে ২০২৩ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ মে ২০২৩ ১১:৫২ পিএম
advertisement..

করোনার সময় থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আকর্ষণ হারাতে থাকে। এর আগে কি খুব আকর্ষণীয় ছিল? প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ২ কোটি ১ লাখের বেশি। তা ২০১৮ সালে ছিল ২ কোটি ৯ লাখ ১৬ হাজার। এর মানে, করোনাকে বলির পাঁঠা বানানোর আগে আমাদের একটু ভেবে দেখতে হবে। দোষটি আসলে কার? এক সময় বিদ্যালয়ের দেয়ালগুলোকে মনোগ্রাহী করে তুলতে তেলচিত্র দিয়ে ভরিয়ে তোলা হয়। সব প্রাইমারির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হয়েছে। সব শ্রেণিতে বই দেওয়া হয় বিনা পয়সায়। নতুন বইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নতুন পোশাক কেনার অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, বেতন নেওয়া হয় না। উল্টো উপবৃত্তি দেওয়া হয়। বিস্কুট, মিড ডে মিলের হাতছানি, বসানো হয়েছে লোহার ফটক (অবশ্য সেসব ফটকে চাপা পড়ে আহত-নিহত হয়েছে বেশ কয়েক শিক্ষার্থী)। বসেছে ছেলেমেয়েদের আলাদা ল্যাট্রিন। প্রতিবন্ধীদের জন্য আছে র‌্যাম্প। বসেছে দোলনা, ঢেঁকি খেলাসহ আরও কত কী!! অনেক দূর থেকে এখন স্কুলগুলো দেখলে চেনা যায় আমাদের প্রাথমিক স্কুল। এত রঙ-চঙ, এত উপাচার। এর পরও শিশুদের মিছিল আর প্রাথমিক স্কুলের দিকে ঘুরছে না।

ঢাকার কাছে টাঙ্গাইলের কোনো এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্প্রতি অন্য কাজে মাঠ পরিদর্শনে গেলে কৌতূহলের বসে কয়েকটি প্রাথমিক স্কুলে যাত্রাবিরতি করেন। তিনটি স্কুলের একটিতেও তিনি শিক্ষার্থীদের তেমন দেখা পাননি। কাগজ-কলমে যাদের নাম আছে, তাদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশই অনুপস্থিত; অনুপস্থিত শিক্ষকরাও। কারও পেটেব্যথা, কারও ফুফুশাশুড়ি ইন্তেকাল করেছেন, কারও খালুশ্বশুর তীর্থে যাবেন বলে দেখা করতে গেছেন ইত্যাদি ‘জরুরি’ কারণ। কোথাও মোবাইল ফোনে কল পাওয়ার পর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছেন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষকরা বরং নির্বাহী কর্মকর্তাকে দুষেছেন, হায়-আফসোস করেছেনÑ ‘একটা খবর দিয়া আইতেন’, কিছু খেদমত করতে পারলাম না। খবর দিয়ে গেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিঃসন্দেহে অন্য দৃশ্য দেখতেন। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সন্তোষজনক উপস্থিতি দেখাতে খুব একটা অসুবিধা হতো না তাদের।

advertisement

আমরা ডুমুরিয়ার ময়নাপুর সরকারি প্রাথমিক স্কুলের কথা জানি। দুর্গম এই জনপদে মাত্র একজন শিক্ষার্থী বর্তমান আছে। টাঙ্গাইলের এই উপজেলা দুর্গম কোনো জনপদ নয়। এর পরও চলছে শিক্ষার্থীর খরা।

গত এপ্রিল মাসে এক সংবাদকর্মী টাঙ্গাইলের পাশের জেলা ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নের সব কয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে প্রকৃত অবস্থা জানার চেষ্টা করেন। সরেজমিন খোঁজখবর নিয়ে কোনো ভালো খবর দিতে পারেননি। তিনি জানিয়েছিলেনÑ রাজৈ ইউনিয়নে যে ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত উপস্থিতি আর কাগজ-কলমে উপস্থিতির সঙ্গে দুস্তর ফারাক। মধ্যরাজৈ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডা. এম আমানউল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সজনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ চাঁন্দাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছেÑ প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যা কম। অলস সময় পার করছেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলে আশপাশের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠাসহ নানা অজুহাত দাঁড় করান শিক্ষকরা। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার্থী কম থাকায় সোহাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রক্সি দিচ্ছে চতুর্থ শ্রেণিতে। অর্থাৎ ওই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। সময়মতো ক্লাসে না আসার অভিযোগও রয়েছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। পড়ালেখা না হওয়ায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন।

দক্ষিণের জেলা ঝালকাঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ৫০ কিংবা এর কমসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছেÑ এমন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর একটি তালিকা তৈরি করেছে। ওই তালিকায় কাঁঠালিয়া উপজেলাতেই আছে ২৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়Ñ যেখানে ৫০-এর কম শিক্ষার্থীর নাম আছে স্কুলের খাতায়। রাজাপুর, নলছিটি ও ঝালকাঠি সদরে এমন স্কুলের মোট সংখ্যা হবে প্রায় ৪০। অনেকেরই নাম আছে শুধু খাতা-কলমে, আসল উপস্থিতি গড়ে ২০-২৫ বা এর কম।

গত বছরের ১৬ মে (২০২২) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের করা ২০২১ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারির বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩ শতাংশ কমেছে। অবশ্য ঝরে পড়ার হার কমার পাশাপাশি নতুন শিক্ষার্থীর হার কমারও ইঙ্গিত ছিল প্রকাশিত শুমারিতে। করোনাকালে এক বছরের ব্যবধানে প্রাথমিকে মোট শিক্ষার্থী কমেছে সাড়ে ১৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিক স্তরে আট লাখের বেশি শিশুশিক্ষার্থী কমেছে। অথচ প্রতিবছর শিক্ষার্থী বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। সারাদেশে বেসরকারি খাতের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (মূলত কিন্ডারগার্টেন) সংখ্যাও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

কেন এমন হচ্ছে?

যেহেতু এসব নিয়ে কোনো বস্তুনিষ্ঠ ধারাবাহিক গবেষণা, সরেজমিন মাঠ পর্যবেক্ষণ বা গণসংলাপ নেইÑ সেহেতু যে যার মতো করে এই প্রশ্নের একটা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। বলাবাহুল্যÑ যার স্বার্থ রক্ষা করে কুল বাঁচিয়ে রাজনৈতিক সঠিকতা (পলিটিক্যাল কারেক্টনেস) প্রভৃতি মাথায় রেখে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন।

এত সুন্দর রঙচঙ্গা স্কুল আর প্রচুর প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষকদের কাছে না পাঠিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কেন পাঠান অভিভাবকরা? বেশির অভিভাবকের সোজাসাপটা জবাবÑ ‘ওখানে লেখাপড়া হয় না। যেখানে হয়, সেখানে পাঠাই।’

‘কাজের’ লেখাপড়া যে কম হয়, সেটি প্রাথমিক শিক্ষকরাও মনে মনে বিশ্বাস করেন। তাই তারাও তাদের ছেলেমেয়েদের অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠান। এটি বন্ধের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক সময় বেশ মরিয়া হয়ে উঠেছিল। অফিস নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। সচিব সাবধান করে বলেছিলেনÑ ‘আমাদের সার্কুলার আছে যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তান যারা আছে; তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়াতে হবে। আমরা সেটি আবারও তাদের স্মরণ করে দেব। অর্থাৎ আমরা আবার নিশ্চিত করব যে, কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছেলেমেয়েরা কিন্ডারগার্টেনে পড়তে পারবেন না। এটি কঠিন হলেও আমরা করব। মনিটরিং কার্যক্রমটা জোরদার করতে হবে। ক্লাস্টারপ্রধান হিসেবে যারা কাজ করেন, তাদের ভিজিটিং কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে। উপজেলায় যেসব কর্মকর্তা আছে, তাদের একেকটা স্কুলের মেন্টর নিয়োগ করতে পারি। এই দায়িত্ব দেওয়া হলো’ (১৫ জানুয়ারি ২০১৯ ঢাকার চার উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সচিবের ভিডিও কনফারেন্স শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ)। এসব মানবাধিকারবিরোধী তর্জন-গর্জন মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যে অচল, তা খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে।

যারা শিক্ষকদের নেতা হয়েছেন বা শিক্ষকদের কাঁধে পা রেখে ওপরে উঠতে চান, তারা বলছেনÑ শিক্ষকদের মানসম্মান বৃদ্ধি করলে, তাদের সবাইকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার মর্যাদা দিলে তারা পাঠদানে মনোযোগী হবেন; শিক্ষার্থীরাও ফিরে আসবে। তাদের এটিও মনে হয়, শিক্ষকদের শূন্যপদ পূরণ হতে দেরি হওয়ায় অন্যদের ওপর চাপ পড়ছে। তাই শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে আর শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছে। নেতাদের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। আর প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এগুলো পূরণ করলেই সব মেঘ কেটে যাবে।

অনেক শিক্ষকের ধারণা, তাদের ক্যাচমেন্ট এলাকায় অন্য প্রতিষ্ঠান হতে না দিলে, মাধ্যমিক স্কুলগুলো থেকে প্রাথমিক স্তর তুলে দিলে শিক্ষার্থীরা আবার সুরসুর করে সরকারি প্রাথমিকে ফিরে আসবে।

অনেক শিক্ষক মনে করেন, ভর্তি প্রক্রিয়ায় তারা পিছিয়ে পড়েন। তাই অন্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা চলে যায়। প্রতিবছরের ১৬ নভেম্বর থেকে বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয় তাদের প্রথম শ্রেণিসহ ভর্তির কার্যক্রম শুরু করে। কিন্ডারগার্টেনসহ সব বিদ্যালয়ের ভর্তি শেষ হলে জানুয়ারিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী ভর্তির ঘণ্টা বাজে। এসব শিক্ষক মনে করেন, প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকার জন্য অবশ্যই তাদের নভেম্বর থেকে ব্যানার, ফেস্টুন টানিয়ে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন।

এই তর্কবিতর্কের মধ্যে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস জানায়Ñ যদিও পাঠ্যক্রম অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থীর প্রাক্-প্রাথমিকেই বাংলা বর্ণমালা ও গণিতের ১ থেকে ২০ পর্যন্ত শিখে ফেলার কথা, তবুও তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অনেক শিক্ষার্থীরই বাংলা বর্ণ ও গণিতের সংখ্যা চিনতে সমস্যা হচ্ছে। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘৬৪ জেলার ৬২ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর জরিপটি চালানো হয়। এটি অনেক বড় একটি গবেষণা। এতে দেখা গেছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীই জটিল (কমপ্লেক্স) বাক্য ও শব্দ পড়তে পারে না। এটি আমাদের শিক্ষার সংকটকে নির্দেশ করে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে আমাদের শিক্ষার এই সংকট দূর করতে হবে।’

বিআইডিএসের গবেষণা অভিভাবকদের শঙ্কা বা অনুধাবনকে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সঠিক প্রমাণ করেছে। শিক্ষার্থীরা যেখানে কাজে লাগার শিক্ষা পাবে, সেখানেই তারা ভিড় করবে। দেয়াল সুন্দর, না গেট সুন্দর; বিস্কুট দেয়, না পানি দেয়Ñ সেটি তাদের বা অভিভাবকদের বিবেচ্য বিষয় নয়। শিক্ষক আর শিক্ষা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নেই কোনো স্তরেই।

গওহার নঈম ওয়ারা : লেখক ও গবেষক